আজ- সোমবার, ১৪ই জুন, ২০২১ ইং, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  Empathy, Patriotism & Commitment Group: একটু বিশ্লেষণ       বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

লৌহজং লংমার্চঃ নদী উদ্ধারে `নয়া-আন্দোলন’

20161128_191608resize-of-20161129_093653 resize-of-20161129_105806 resize-of-20161129_11131415220002_1271127106264079_7723315927042550404_n 15232291_376373132706926_5229949338191413303_nresize-of-20161129_105639 resize-of-img_20161129_11563515253605_207046186409877_2640444404724572407_nlouhojang_river_photo_jpg

টাঙ্গাইলের লৌহজং নদীর দুধারে জং ধরেছে। অনেকদিন থেকেই। দখলের দাপট, নাগরিক অবহেলা আর আবর্জনার অত্যাচারে নদীটিকে নর্দমা বলে মনে হয়। এতোকাল কেউ গা করেনি। জং তোলা সম্ভব নয় ভেবে কেউ ‘রা’ করেনি। কিন্তু জেলা প্রশাসক মোঃ মাহবুব হোসেন ‘রা’ করেছেন। সাড়া পড়তেও সময় লাগেনি।

অনুপ্রেরণা ও শুরু

আড়াই বছর আগে যোগদানের সময়ই টাঙ্গাইলবাসী লৌহজং নদী ‍উদ্ধারের দাবী জানিয়েছিল ডিসি মহোদয়ের কাছে। কিন্তু সামরিক বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো শক্তি প্রয়োগ করে স্থায়ী সমাধান হয়না বলে জনগণকে সচেতন ও সোচ্চার করার উপায় খুঁজছিলেন তিনি। হঠাৎই মাস ছয়েক আগে সোশাল মিডিয়ায় বরিশালের জেলখাল অভিযান ও সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপের কথা জানার পর তিনি উৎসাহিত হন। বরিশালের আদলে টাঙ্গাইলে সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপ গঠিত হয়। ‘জেলা প্রশাসন, টাঙ্গাইল’ ফেসবুক পেজে এবং ‘পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপে আলোচনা চলতে থাকে। মূখ্য সচিব জনাব আবুল কালাম আজাদ এবং এটুআই এর মানিক মাহমুদের উসকে দেয়া উৎসাহে প্রবাহিত হতে শুরু করে লৌহজং নদীকে প্রবাহমান করার প্রয়াস।

ঘর গোছানো

শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। ৭৬ কি.মি. দীর্ঘ লৌহজং নদীকে প্রবাহমান করার কয়েক মাসের ধারাবাহিক কার্যক্রমকে পদ্মাকে প্রবাহমান করার ‘ফারাক্কা লংমার্চ’ এর সাথে মিলিয়ে ‘লৌহজং লংমার্চ’ বলাই যায়। টাঙ্গাইল পৌরসভার মধ্যেই পড়েছে নদীর প্রায় ১০ কি.মি. অংশ। দখল আর অত্যাচার এই ১০ কিলোমিটারেই বেশী। নদীকে নর্দমা বানিয়ে ফেলার কাজে শুধু ব্যক্তি নয় প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকাও আছে। সম্প্রতি লৌহজং নদীর সীমানা নির্ধারণ করে লাল পতাকা লাগানো হয়েছে, অবৈধ স্থাপনায় লাল রং দিয়ে ক্রস চিহ্নও দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নিয়মিত মাইকিং করা হয়েছে। প্রথমদিকে বিষয়টি মাথায় না নিলেও অভিযানের দুদিন আগে হঠাৎ করেই স্থানীয়রা তাদের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে শুরু করেন। ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় এমন চিত্রই দেখা গেছে বেড়াডোমা ব্রীজ সংলগ্ন এলাকায়।

এই চিত্রটি রাতারাতি তৈরী হয়নি। শুরু থেকেই সোশাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি জেলা সমন্বয় সভা ও আইন শৃংখলা রক্ষা বিষয়ক সভায়ও আলোচনা হয়েছে। ফেসবুকে জনমত গঠনের পাশাপাশি গণসাক্ষর কার্যক্রমও চলেছে। আমরা জানি জনগণ নানা দাবীতে ডিসিকে স্মারকলিপি দেয়। এখানে টাঙ্গাইলের ডিসিই মানববন্ধন করেছেন, লিফলেট বিলিয়েছেন। গান রচিত, গীত এবং চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। ভিডিও ক্লিপ তৈরী করা হয়েছে। নিরালা মোড়ে সাংবাদিক রতন সিদ্দিকীর আলোকচিত্র প্রদর্শনী ছিল আর এক অভিনব সংযোজন। সর্বোপরি যখন যা করা হয়েছে তা সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হয়েছে।

সমানুভূতি

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী শাসন, পৌরসভার নদী শোষণ (রাস্তা বানাতে) আর টেক্সটাইল ও রাইস মিলের নদী দূষণ এর বিপরীতে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন যা করেছে তার নাম মোটিভেশন। সানোয়ারুল হক (এসি ল্যান্ড, টাঙ্গাইল সদর) বললেন গত দুমাস ধরে নদীর অংশে ঘর তুলে বাস করা মানুষদের সাথে এমনভাবে মিশেছি, বুঝিয়েছি যে শুরুতে তারা আমাকে সাংবাদিক ভাবতো। জেলা প্রশাসক মোঃ মাহবুব হোসেনের কন্ঠেও সমানুভূতির সুর কারণ লৌহজং দখলকারীদের অধিকাংশই কোন না কোন ভাবে প্রতারিত। তারা টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছ থেকে জমি কিনে স্থাপনা তৈরি করেছে। এমন কিছু দখলকারীও আছে যাদের অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাই পুনর্বাসনের জন্য ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা করা হচ্ছে বলে জানালেন। আর দেখালেন হাতের কাছে রাখা ক্ষতিগ্রস্থদের এক ব্যাগ জাতীয় পরিচয়পত্র। প্রশাসন এখানে শাসনের  লাঠি  দিয়ে নয় সচেতনতার বাঁশি বাজিয়ে কাজ করছে।

লৌহজং এর প্রবাহ

২৯ নভেম্বর বেড়াডোমা ব্রিজের দুপাশে ২ কিলোমিটার হাজরা পুকুর থেকে কাগমারী অংশে নদী উদ্ধারের কাজ হলো। দুমাসের ক্র্যাশ প্রোগ্রামের শুরু এটি। শুরর দিন  প্রায় ৬০ টি সরকারী প্রতিষ্ঠান; কয়েক ডজন বেসরকারী সংস্থা, সুশীল সমাজ, সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, শতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি; জেলা পরিষদের প্রশাসক, বরিশাল ও টাঙ্গাইল সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপ, সামাজিক সংগঠন ‘পরিবর্তন চাই’, বিভিন্ন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন; ১২ জন ইউএনওর নেতৃত্বে প্রায় ৫০০ কর্মী; ১১ টি পৌরসভা হতে ১০০ জন কর্মী, শতাধিক প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া কর্মী, ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ, পাঁচ শতাধিক ইউডিসি, পিডিসি, গ্রাম-পুলিশ, ইউপি সচিব; সহস্রাধিক ছাত্র-ছাত্রী, স্কাউট, রোভার স্কাউট,  প্রায় ১০০ জন পরিবহন মালিক শ্রমিক সমিতির কর্মী, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ৮০০০ মানুষের বিশাল এক মিলনমেলা। একটু আড়ম্বরের সাথে আরম্ভ করা হয়েছে এটা সত্য। শক্তি প্রয়োগের জন্য এসবের প্রয়োজন হয়না কিন্তু সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এটুকু আড়ম্বরের প্রয়োজন ছিল। মুখ্য সচিব মহোদয়ও ফেসবুকে এই উদ্ধার অভিযানের খুঁটিনাটি জানতে চেয়ে মন্তব্য করছেন। পরামর্শ দিয়েছেন। যা আরও বেশি উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। আগামী দুসপ্তাহ কোনদিন কোন ইউএনওর নেতৃত্বে কার্যক্রম চলবে তার তালিকা ইতোমধ্যে প্রণীত হয়েছে দেখলাম।

সোশাল মিডিয়া ও সিটিজেন জার্নালিজমের প্রবাহ

আমন্ত্রিত হয়ে বরিশাল সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপের ৫০ জন সদস্য টাঙ্গাইল এসেছেন। টাঙ্গাইল সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপকে সহযোগিতা করতে। একটি সফল অভিযানের (জেল খাল) অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপের আরেক জেলায় আসার বিষয়টি এতোটাই আলোচিত হয়েছে যে অচেনা কাউকে দেখলেই মানুষ প্রশ্ন করেছে আপনি কি বরিশাল থেকে এসেছেন। আশা করি সরকারের মধ্যে এ ধরণের সামাজিক আন্দোলন সংগঠিত করার প্রশ্নে এক জেলার সফল অভিজ্ঞতা অন্য জেলা কাজে লাগাবে এবং তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। টেকসই উন্নয়নের জন্যও এটা জরুরী। সিটিজেন জার্নালিস্টদের এলাকার বাইরে গিয়ে ভূমিকা রাখার ঘটনা এটিই প্রথম কিন্তু উৎসাহিত করা হলে এটি প্রবাহিত হতেই থাকবে।

লক্ষ্যণীয় বিষয়

১। কয়েক মাস আগে সোশাল মিডিয়ায় বরিশালের সফল জেলখাল অভিযানের কথা জেনে লৌহজং নদী উদ্ধার কার্যক্রম উৎসাহিত ও সংগঠিত হয়।

২। প্রশাসনের  সাথে জনগণের সম্পর্কটি সহজ ও স্বাভাবিক হয়েছে। এমপ্যাথেটিক এ্যাপ্রোচের কারণে জেলা প্রশাসন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।

৩। এখানে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, জন প্রতিনিধি, সিটিজেন জার্নালিস্ট সবাই নদী পুনরুদ্ধারে প্রথম থেকেই একসাথে কাজ করেছে। বরিশালে জন প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শেষ সময়ে যোগ দিয়েছে।

৪। জনবান্ধব জনপ্রশাসনের প্রথম নদী উদ্ধার কার্যক্রম।

৪। বরিশালে বলা হয়েছিল ‘জনগণের জেল খাল, আমাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান’। টাঙ্গাইলে বলা হলো ‘লৌহজং নদী পুনরুদ্ধার ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম’। টেস্ট কেস বিধায় বরিশালে উদ্ধার পরিচ্ছন্নতার আড়ালে ছিল। কেস তো ইতোমধ্যে টেস্টেড তাই টাঙ্গাইলে নদী উদ্ধার আড়ালে না থেকে স্পষ্ঠভাবে উচ্চারিত হয়েছে। এই উচ্চারণ আগামীতে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হবার কথা।

৫। দুমাসের ক্র্যাশ প্রোগ্রামের শুরু এটি। আগামী দুমাস ধরে চলবে কাজ।

৬। এক জেলার সফল শিক্ষা থেকে অন্য জেলা শিক্ষা গ্রহণ করলো।

৭। সিটিজেন জার্নালিস্টদের এলাকার বাইরে গিয়ে ভূমিকা রাখার ঘটনা এটিই প্রথম।

৮। সোশাল মিডিয়ায় উচ্চপদস্থ এমনকি নীতি নির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ উৎসাহ, পরামর্শ এবং নির্দেশনা দিয়েছেন।

ভবিষ্যৎ প্রবাহ

টাঙ্গাইলের মানুষ স্বপ্ন দেখছে, এই নদীতে অতীতের মত আবারও বিচিত্র মাছ পাওয়া যাবে। নৌপথ চালু হবে। নানারকম বর্জ্যের দূষণ থেকেও মুক্ত হবে নদী এবং নগরী। নদীর দুধারে বৃক্ষরোপণ ও ওয়াকওয়ে তৈরি হবে। আরও কত কী!

সোশ্যাল মিডিয়াকে ও সিটিজেন জার্নালিজম ব্যবহার করে, সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যদি আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তবে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। বরিশালের জেলখাল ও টাঙ্গাইলের লৌহজং নদীউদ্ধার অভিযান তারই দৃষ্টান্ত।

৩ সেপ্টেম্বর বরিশালের জেল-খাল উদ্ধার অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এক নতুন যাত্রা। কীর্তনখোলা থেকে লৌহজং। এরপর লৌহজং থেকে হয়তো ইছামতি। তারপর ইছামতি থেকে শ্যামসুন্দর, শ্যামসুন্দর থেকে ঘাঘোট, ঘাঘোট থেকে করতোয়া। গণমানুষের নদী-খাল দীর্ঘদিন পর আবার তারা ফিরে পাচ্ছে। এই নয়া-আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ুক দেশজুড়ে।

পুনশ্চঃ পরিত্যাক্ত স্থানে গড়ে তোলা টাঙ্গাইলের নয়নাভিরাম ডিসি লেক যাঁরা দেখেছেন তাঁরা বুঝবেন লৌহজং নদী উদ্ধারের ড্রেস রিহার্সেল হয়েছে ডিসি লেকে।

Categories: উদ্ভাবন