আজ- শনিবার, ৮ই মে, ২০২১ ইং, ২৪শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  Empathy, Patriotism & Commitment Group: একটু বিশ্লেষণ       বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

ফেসবুক ব্যবহার করে ত্রিশালে সবুজ বিপ্লব

গত চার মাসে ত্রিশালের প্রতিটি মানুষ যেন ‘সবুজ-ত্রিশাল আন্দোলন’-এর সঙ্গে এক অদৃশ্য ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে গেছেন। গত পহেলা অক্টোবর, এক দিৃনেই  ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে ১ লাখ ৮৫ হাজার গাছের চারা বিতরণের মাধ্যমে ত্রিশালবাসী দৃষ্টান্ত গড়েছেন।

2-1-762x420বিতরণকৃত গাছের চারা যেন অকালমৃত্যুর মুখে না পড়ে সেজন্য গ্রহণ করা হয়েছে ধারাবাহিক উদ্যোগ। ‘তোমার গাছটি কেমন আছে’ শীর্ষক একটি হেলথ কার্ড প্রদান করা হয়েছে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে। যে দেশে মানুষেরই হেলথ কার্ড নেই সেদেশে গাছের হেলথ কার্ড অভিনব, চ্যালেঞ্জিং এবং সাহসী পদক্ষেপ সন্দেহ নেই। এছাড়া প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে একটি মাসিক প্রতিবেদন ফরম এবং সব সময় যোগাযোগ ও পরামর্শের জন্য একটি হটলাইন নম্বরও প্রদান করা হয়েছে। দাদী বেঁচে থাকলে বলতেন – ‘‘ঠিকই আছে, গাছ লাগানোর চেয়ে গাছ ‘মানুষ’ করা কঠিন’’।

এই উদ্যোগের ফলে প্রতিটি শিক্ষার্থীই তাদের প্রাপ্ত চারাটিকে যেন একান্তই নিজের বন্ধু হিসেবে ভাবতে শিখেছে। চারাটি যেন পরিবারের একজন নতুন সদস্য। অন্যদিকে চারাটিও পেয়েছে একজন কোমল মনের অভিভাবক।

ত্রিশালে এই সবুজবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল আজ থেকে চার-পাঁচ মাস আগে। এই কর্মসূচিটি শুরু করা হয়েছিল কোথাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সঙ্গে সভা করে, কখনো মাইকিং করে, আবার কখনো ফেসবুকে লিখে। ধীরে ধীরে সামাজিক আন্দোলনের রূপ পায় ত্রিশালকে সবুজ করার ‘সবুজ আন্দোলন’। তবে এজন্য ত্রিশালেন ইউএনও জনাব আবু জাফর রিপনকে ছুটতে হয়েছে চার মাস। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে হাজির হয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উৎসাহিত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের ফেসবুক মাধ্যমটি ব্যবহার করার ফলে সবাই খুব দ্রুত এই আন্দোলনটি সম্পর্কে জানতে পেরেছে। মতামত প্রদান করেছে। একজনের ওয়াল থেকে অন্যজনের ওয়ালে শেয়ার করা হয়েছে। গাছ সংগ্রহ ও রোপনে সবাই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গত  চার মাস ধরে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই চারা বিতরণ করা হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে ফেইসবুকে পোস্ট করা হয়েছে। ফেসবুকে হাজার হাজার মানুষ উৎসাহ দিয়েছে এই আন্দোলনকে, একইসঙ্গে বেড়েছে আগ্রহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। মজার বিষয় হলো এসময় এলাকার ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্টও নাকি এসেছে বেশী বেশী। যার বাস্তব প্রমাণ মিলবে ১ অক্টোবর ও এর সামনে পিছনের কয়েকদিনের Uno Trishal এবং Abu Jafar Ripon আইডি দুটির টাইমলাইনে।

গত চার-পাঁচ মাসের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায়  ১ লাখ ২০ হাজার চারা বিতরণ করার পরে অক্টোবরের ১ তারিখে ১ লাখ ৮৫ হাজার চারা বিতরণের মহাযজ্ঞের মাধ্যমে ৩ লক্ষাধিক চারা বিতরণের লক্ষ পূরণ হয়েছে উপজেলা প্রশাসন ত্রিশালের। বছরে ১০ কোটি বৃক্ষ রোপণের জাতীয় টার্গেটকে ৪৮৯ উপজেলা দিয়ে ভাগ করলে প্রতি উপজেলার ভাগে পড়ে ২,০৪,৪৯৮। সে হিসাবে উপজেলা প্রতি বার্ষিক জাতীয় টার্গেট ১ দিনেই প্রায় অর্জিত হয়েছে। যদি এক লক্ষ গাছও টিকে থাকে আর ১০ বছর পরে এক একটি গাছের মূল্য হয় ১০ হাজার টাকা তাহলে ১০০ কোটি টাকার সম্পদ সৃষ্টি হবে আশা করা যায়। পরিবেশ এর ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত থেকে আমাদের শিশুরা যদি বাজে আসক্তি থেকে দূরে থাকে সেটি হবে মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো সুখের।

এই উদ্যোগে সকল14708134_1185715548153322_6532650738329932169_n পেশার মানুষের সম্পৃক্ততা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে অসংখ্যবার, স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোতে হয়েছে প্রধান শিরোনাম এবং ডকুমেন্টারি দেখানো হয়েছে প্রায় সবগুলো টিভি চ্যানেলে। যমুনা টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিতও হয়েছে। অনেকে একে লোক দেখানো কাজ ভাবতে পারে কিন্তু ভাবতে পারে না এরকম লোক দেখানো কাজ সবাই করতে শুরু করলে তো দেখানোর লোকই থাকবে না।

এখন অনেকে ফেসবুকে গাছের ছবি দিয়ে আপডেট জানাচ্ছে। মাস শেষে ছাত্র/ছাত্রীরা গাছের হেলথ কার্ডের মাধ্যমে গাছের খবর (জীবিত, মৃত বা অসুস্থ) প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জানাবে। প্রতিষ্ঠানগুলো মাসিক প্রতিবেদন দেবে। মাস শেষে কয়টি গাছ জীবিত আছে জানা যাবে। ঠিক একই ভাবে গাছের হেলথ কার্ডের হট লাইন নম্বর থেকে পাওয়া অভিযোগ ও প্রদত্ত সমাধানেরও হিসাব রাখা হচ্ছে। গাছের হেলথ কার্ডকে যদি গাছের জন্ম নিবন্ধন বলি তাহলে অসুস্থতা ও মৃত্যু নিবন্ধনেরও ব্যবস্থা আ14732295_1189526957772181_4328432712400046378_nছে বলতে হবে।

তিনটি কারণে ‘সবুজ ত্রিশাল একটি অনন্য উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে:

  • ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের সম্পৃক্ততায় এক দিনে প্রায় ২ লক্ষ বৃক্ষরোপণ সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
  • যে দেশে মানুষের হেলথ কার্ড নেই সে দেশে গাছের হেলথ কার্ড আইডিয়াটি যথেষ্ট ইনোভেটিভ।
  • এই কার্যক্রমে নীতি নির্ধারকদের তরফ থেকেও ফেসবুকে খোঁজ নেওয়া, পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যেমন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব মহোদয় পরামর্শ দিয়েছেন শ্রেষ্ঠ পরিচর্যাকারীকে পুরস্কৃত করা ও ‘বৃক্ষ পরিচর্যা সপ্তাহ’ পালন করা। (শুনেছি গাছের হেলথ কার্ড নামটিও কেবিনেট ডিভিশনের সংস্কার ও সমন্বয় সচিব মহোদয়ের দেয়া। তবে সেটা ফেসবুকে নয় ফেস টু ফেস।)

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘আমরা আড়ম্ভ করি, শেষ করি না; আমরা আড়ম্বর করি, কাজ করি না’। এখানে আরম্ভ করা হয়েছে। আড়ম্বরের সঙ্গে কাজও করা হয়েছে। এই ‘আরম্ভ’কে ধরে রাখার তৎপরতাও জোরেশোরে চলছে। অতঃপর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালের নতুন কবি, তরুণ কর্মবীর ইউএনও জনাব আবু জাফর রিপনকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য অভিনন্দন জানাতেই হয়।

Categories: উদ্ভাবন