আজ- সোমবার, ১৬ই জুলাই, ২০১৮ ইং, ৩১শে আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস       দেশের প্রথম ‘স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং’ সম্মেলন    

লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি

লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি  

জেলা প্রশাসক টাঙ্গাইল হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর থেকেই স্থির করেছিলাম একটা দাগ রেখে যাবো। এমন একটা সুখের স্মৃতি নিয়ে ফিরে যাবো, যা শুধু আমার জন্য নয়, অন্য অনেকের জন্য আনন্দদায়ক ও শিক্ষণীয় হবে। ২০১৬ সালে তা খুঁজে পাই। স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। স্বপ্ন দেখাতে শুরু করি। লৌহজং নদীতে নৌকাবাইচ হবে, আবারো এই নদীর স্বচ্ছ পানিতে নানা জাতের মাছ ঢেউ তুলে বেড়াবে, ৭৬ কিলোমিটার নদীর দু’পাশ হয়ে উঠবে মানুষের বিনোদন কেন্দ্র – এমন স্বপ্ন। ভাবতে শুরু করি কিভাবে এই সকল পরিবর্তন টাঙ্গাইলের অর্থনীতি ও সামাজিক খাতের জন্য সহায়ক হয়ে উঠবে। টাঙ্গাইলের সকল পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে ‘সামাজিক আন্দোলন’ গড়ে তোলা, অন্যান্য জেলার অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, এটুআই ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিরলস সমর্থন এই আন্দোলনকে সফলভাবে শুরু করার ক্ষেত্রে দারুণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে সবচেয়ে বড় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে ‘ফেসবুক’। স্বপ্ন বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

অনেকেই হয়তো জানেন না টাঙ্গাইলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ৭৬ কিঃমিঃ দীর্ঘ লৌহজং নদীর দুধারে জং ধরেছিল। দখলের দাপট, নাগরিক অবহেলা আর আবর্জনার অত্যাচারে নদীটিকে নর্দমা বলে মনে হতো। সোশ্যাল মিডিয়া ও সিটিজেন জার্নালিজম ব্যবহার করে, সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যদি আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তাহলে আপাত অসম্ভবকে যে সম্ভব করা যায় টাঙ্গাইলের লৌহজং নদী উদ্ধার অভিযান ছিল তারই দৃষ্টান্ত। এটিই ছিল জনবান্ধব জনপ্রশাসনের প্রথম নদী উদ্ধার কার্যক্রম। জেলা প্রশাসন, বরিশালের জেলখাল উদ্ধার অভিযান থেকে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম কিন্তু ৪ কিঃমিঃ খাল আর ৭৬ কিঃমিঃ নদীর মাঝে উনিশ গুণ তফাৎ। আমার ভাল লাগছে যে ৫ মাসের মাথায় জেলা প্রশাসন, বাগেরহাট ভৈরব নদকে ঘিরে একই ধরণের কার্যক্রম গ্রহন করেছে। আগামীতে ইছামতি, ঘাঘট, খাকদোন, করতোয়া এবং অন্যান্য নদী উদ্ধারে অভিযান পরিচালিত হলে আমার, টাঙ্গাইল সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপের তথা টাঙ্গাইলবাসীর নিশ্চয়ই পথ দেখানোর অনুভূতি থেকে অনেক ভাল লাগবে। আমারও ভাল লাগবে কারণ –

সামাজিক আন্দোলনের সূচনা
একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম। আমার কর্মজীবনে একটা ‘দাগ’ রেখে যেতে চেয়েছি যা কেবল টাঙ্গাইলের জন্য নয়, সারাদেশের জন্য কাজে আসে। অন্য জেলার অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে টাঙ্গাইলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি ভিন্ন ধরনের উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে চেয়েছি। এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় নাগরিক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, তরুনদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। এটাকেই সামাজিক আন্দোলন বলতে চাই। আমি বিশ্বাস করি ফেসবুকের মাধ্যমে তা সম্ভব করা সহজ হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বাধা
আমার মনেহয় সবচেয়ে বড় বাধা আসলে আত্মবিশ্বাসের অভাব। এতো বড় কাজ করার অভিজ্ঞতা তো ছিল না। ৩/৪ কিলোমিটার নয় পুরো ৭৬ কিঃমিঃ নদী পুনরুদ্ধারের কথা ভাবতে ভাবতেই ৭৬ মাস চলে যেতে পারতো। কিন্তু বুঝলাম মানুষকে সম্পৃক্ত করে মানুষের কাজে নামলে সমর্থনের অভাব হয় না। রাজনৈতিক, সামাজিক বাধা ছিল অনেক। প্রভাশালীদের বাধা ছিল। অপদখলকারীদের অধিকাংশই ছিল গরীব মানুষ, তারা কারো না কারো কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে জায়গা কিনে ঘর তুলেছে। তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও ভাবতে হয়েছে। টাঙ্গাইল পৌরসভার মধ্যেই পড়েছে নদীর প্রায় ১০ কি.মি. অংশ। দখল আর অত্যাচার এই ১০ কিলোমিটারেই বেশী। নদীকে নর্দমা বানিয়ে ফেলার কাজে শুধু ব্যক্তি নয় প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকাও আছে। প্রথমে সীমানা নির্ধারণ করে লাল পতাকা লাগানো হয়েছে। অবৈধ স্থাপনায় লাল রং দিয়ে ক্রস চিহ্ন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নিয়মিত মাইকিং করা হয়েছে। প্রথমদিকে বিষয়টি মাথায় না নিলেও অভিযানের দুদিন আগে স্থানীয়রা তাদের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে শুরু করেন। শুরুতে বেড়াডোমা ব্রিজের দুপাশে ৩ কিঃমিঃ অংশে কাজ করা হয়েছে কিন্তু স্বপ্নটি ৭৬ কিঃমিঃ লম্বা।

স্থানীয় মানুষের স্বত:স্ফূর্ততার প্রতি সম্মান প্রদর্শন 
নদীর উপরে যাদের স্থাপনা ছিল, যা বৈধ ছিল না, তা সরিয়ে নিতে প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করিনি। ফেসবুকেই তাদের সম্পৃক্ত করেছি, তাদের পরামর্শ চেয়েছি, তাদের সহয়তা চেয়েছি। অবৈধ স্থাপনা চিহ্ণিত করে তাদের সহায়তা চেয়েছি। এক পর্যায়ে দেখেছি মানুষ নিজেরাই স্বতঃস্ফুর্তভাবেই তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছে। ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনার ফলে একদিকে মানুষ সচেতন হয়েছে, অন্যদিকে একটা সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে। রাজনীতিবিদরাও এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত হয়েছে। ফলে মানুষ স্থাপনা সরিয়ে নিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করে এই আন্দোলনকে সমর্থন যুগিয়েছে।

জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার একটি বড় উদাহরণ লৌহজং পুনরুদ্ধার অভিযান বিষয়ে রচিত ও চিত্রায়িত লিজু বাউলার গাওয়া গান যা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। নিরালা মোড়ে সাংবাদিক রতন সিদ্দিকীর আলোকচিত্র প্রদর্শনী ছিল আর এক অভিনব সংযোজন।

টেকসই সিটিজেন জার্নালিজমের স্বপ্ন 
এই আন্দোলনে সিটিজেন জার্নালিজম ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের সম্পৃক্ততা সরকারের জন্য বিরাট সহায়ক শক্তি। সিটিজেন জানালিস্টদের জন্যও সরকারের সাথে এভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যে উন্নয়ন করা যায়, সামাজিক আন্দোলন করে বড় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব এটা তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। পরিবর্তন ঘটানোর এই সচেতনতা, এই মানসিকতা টেকসই হয়ে থাকবে। জেলা প্রশাসক পাল্টালেও এতে পরিবর্তন আসবে না বরং এই শক্তি বাড়তেই থাকবে। জেলা প্রশাসক হিসাবে যিনিই আসুন টাঙ্গাইলের এই সহায়ক শক্তিকে তিনি আরো বড় পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। এক জেলার সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপের অন্য জেলায় গিয়ে ভূমিকা রাখার বিষয়টিও টাঙ্গাইল থেকে শুরু বরিশাল সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এখন টাঙ্গাইল সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপের ২৪০০০+ সদস্যকে ‘ওয়াচডগ’ এর ভূমিকায় থাকতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সিটিজেন জার্নালিস্টরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করেছেন। উদ্যোগ ধরে রাখার ভূমিকায় বা পরীক্ষায় তাদের এখনও সেভাবে নামতে হয়নি। প্রথম পরীক্ষাটা বোধহয় টাঙ্গাইল সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপকেই দিতে হবে।

মাছ ও  নৌকা বাইচের স্বপ্ন 
সোশ্যাল মিডিয়া সংলাপে এসডিজি বিষয়ক মূখ্য সমন্বয়ক, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এসেছিলেন টাঙ্গাইলে। কয়েক শত নাগরিক ও সিটিজেন জার্নালিস্টদের সামনে সেদিন সিদ্ধান্ত হয় ২০১৮ সালে লৌহজং নদীতে নৌকা বাইচ হবে। এটা একটা স্বপ্ন। যে নদীর অনেক জায়গায় কাগজের নৌকাও ভাসানো যেত না সেখানে যেদিন নৌকা বাইচ হবে সেদিন দূরে থাকলেও টাঙ্গাইলের অনেক কাছে থাকবো আসলে। টাঙ্গাইলের মানুষ স্বপ্ন দেখছে, এই নদীতে অতীতের মত আবারও বিচিত্র মাছ পাওয়া যাবে। নৌপথ চালু হবে। নানারকম বর্জ্যের দূষণ থেকেও মুক্ত হবে নদী এবং নগরী। নদীর দুধারে বৃক্ষরোপণ ও ওয়াকওয়ে তৈরি হবে। আরও কত কী!

সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন
ইতোমধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে কুড়ি লক্ষ টাকা প্রদান করেছে। প্রতিশ্রুতি আছে আরও। লৌহজং এর নাব্যতা রক্ষা ও দুধারের অপদখল প্রতিরোধে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে এসডিজি বিষয়ক মূখ্য সমন্বয়ককে পত্র প্রেরণ  করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সেই আলোকে কার্যক্রম গ্রহণের জন্য চারটি মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। কেবিনেট ডিভিশন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এর উদ্যোগ আর এসডিজি বিষয়ক মূখ্য সমন্বয়কের ব্যক্তিগত খোঁজখবর এই পরিকল্পনা অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হবে বলে আমার ধারণা।

কেবিনেট সচিব, মূখ্য সচিব, এসডিজি বিষয়ক মূখ্য সমন্বয়ক, কেবিনেট ডিভিশনের সংস্কার ও সমন্বয় সচিব, এটুআই এর ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট, জেলা প্রশাসক, বরিশাল, চেয়ারম্যান, পরিবর্তন চাইসহ সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না। সবাইকে একটি বিষয় লক্ষ্য করতে অনুরোধ করবো যে, লৌহজং পুনরুদ্ধার অভিযানের সাথে এসডিজির ১১ (Sustainable Cities and Communities) ও ১৫ (Life on Land) নম্বর লক্ষ্যের সরাসরি সম্পর্ক আছে।

অনেকেই প্রশ্ন করেছে লৌহজং এর জং তো ওঠালেন, জং প্রতিরোধক অ্যান্টি রাস্ট পেইন্ট তো লাগানো শেষ হলো না। আবার যদি জং ধরে? আমার মনেহয় টাঙ্গাইলের সিটিজেন জার্নালিস্টরাই লৌহজং এর এ্যান্টি রাস্ট পেইন্ট। টাঙ্গাইল ছেড়ে আসার সময় পরিত্যাক্ত স্থানে নয়নাভিরাম ডিসি লেক তৈরীর তৃপ্তি নিয়ে এসেছি। লৌহজং এ আর জং ধরবে না সেই তৃপ্তি নিয়েও এসেছি।

লেখকঃ মোঃ মাহবুব হোসেন, জেলা প্রশাসক, টাঙ্গাইল

Categories: আপনাদের লেখা