আজ- শনিবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৭ ইং, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       বন্যার্তদের জন্য দান নয় ঋণ শোধের আয়োজন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান

গত ২৮ আগষ্ট, ২০১৭ খ্রিঃ তারিখ নদী ও খাল-বিলের পানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী সব ধরনের স্থাপনা অবিলম্বে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের সব জেলা প্রশাসককে জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা পাঠাতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ এলে সকল জেলা প্রশাসকই সেটি করবেন সন্দেহ নেই। অন্তত চেষ্টা করবেন। কিন্তু এরকম নির্দেশ আসার আগেই তিনজন জেলা প্রশাসক ঠিক একাজটিই করেছেন। স্বতঃপ্রণোদিত হয়।

সফল  অভিযান (জেলা)

বরিশাল
প্রথম এ কাজটি করেছিলেন বরিশালের সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক জনাব গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান। তিনি সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে হাজার হাজার বরিশালবাসীকে সম্পৃক্ত করে জেলখাল পুনরুদ্ধারের সফল অভিযান পরিচালনা করেন। বরিশালে পোস্টার, লিফলেট বিলি করে, সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলে, ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আহবান জানিয়ে সার্থকভাবে সম্পন্ন করে পুরো দেশের সামনে অনবদ্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান। বরিশালে শ্লোগান ছিল ‘জনগণের জেল খাল, আমাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান’। ফেসবুকে Barisal Problem & Prospect নামের গ্রুপটির মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার সিটিজেন জার্নালিস্টকে একত্রিত করেছিলেন। শুধু তাই নয় টাঙ্গাইলে লৌহজং পুনরুদ্ধারের উদ্বোধনী দিনে অংশ নেয়ার জন্য ৮০ জন সিটিজেন জার্নালিস্টকে বরিশাল থেকে টাঙ্গাইলে প্রেরণও করেছিলেন। একইভাবে বরিশাল থেকে সিটিজেন জার্নালিস্টদের একটি টিম বাগেরহাটে ভৈরব পুনরুদ্ধারেও অংশ নিয়েছিল। সিটিজেন জার্নালিজমের ধারাকে নদীর মতো দেশব্যাপী প্রবাহিত করার মহান এই উদ্যোগের জন্য জনাব গাজী সাইফ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

টাঙ্গাইল
বরিশালের ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে এরপর টাঙ্গাইলের সাবেক জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ মাহবুব হোসেন আরো বড় কাজে হাত দেন। এবার আর খাল নয়, লৌহজং নদী পুনরুদ্ধার অভিযান। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মানববন্ধন, গান রচনা, চিত্র প্রদর্শনী, লিফলেট বিতরণ প্রভৃতি বিভিন্ন রকম কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণকে লৌহজং পুনরুদ্ধারে সম্পৃক্ত করেন। টাঙ্গাইলে শ্লোগান ছিল ‘লৌহজং নদী পুনরুদ্ধার ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম’।

বাগেরহাট
তৃতীয় নজির স্থাপন করেন বাগেরহাটের বর্তমান জেলা প্রশাসক জনাব তপন কুমার বিশ্বাস। বাগেরহাটের ভৈরব পুনরুদ্ধারে জেলা প্রশাসক জনাব তপন কুমার বিশ্বাস জনসচেতনতামূলক অন্যান্য কাজের পাশাপাশি পৌরসভাকে দারুণভাবে সম্পৃক্ত করে বেশ দ্রুততার সাথে মূল কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাজার হাজার মানুষ ভৈরব পুনরুদ্ধার ও রক্ষার শপথ নেন। বাগেরহাটে শ্লোগান ছিল – ‘ভৈরব নদী রক্ষা ও পরিচ্ছন্ন বাগেরহাট নির্মাণ’।

‘পরিবর্তন চাই’ ও নদী-খাল পুনরুদ্ধার
সামজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘পরিবর্তন চাই’ বরিশালের জেলখাল উদ্ধারে সহ আয়োজক ছিল। টাঙ্গাইলে লৌহজং এবং বাগেরহাটে ভৈরব পুনরুদ্ধারেও ‘পরিবর্তন চাই’ অংশ নেয়। জেলা প্রশাসনগুলোর তিনটি সফল অভিযানেই ‘পরিবর্তন চাই’ অংশ নিয়ে নদী-খাল পুনরুদ্ধারে তার অঙ্গীকার তুলে ধরে।

অন্তত চারজন জেলা প্রশাসক নদী-খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছেন। ঘর গোছানোর কাজ চলছে। এধরণের উদ্যোগে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জনমত তৈরী করা ও জনসম্পৃক্ততা ঘটানো। সে কাজটি সরাসরি ও সোশাল মিডিয়া দুভাবেই চলছে নীচের চারটি জেলায়।

সফলতার পথে অভিযান (জেলা)

বরগুনা
বরগুনার বিষয়টি একটু আলাদা। সেখানে সিটিজেন জার্নালিস্টরা খুবই এ্যাকটিভ এবং সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ বশিরুল আলমও ভারানী খাল ও খাকদোন নদী উদ্ধারে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিলেন। কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদও করা হয়েছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ নুরুজ্জামান ইতোমধ্যেই ঢাকা-বরগুনা লঞ্চ সার্ভিসের নানা অনিয়ম দূর করার কাজে দারুণ সফলতা দেখিয়েছেন। নদী-খাল উদ্ধারেও তিনি সক্রিয়। বাগেরহাটের ভৈরব নদ পুনরুদ্ধারে সিটিজেন জার্নালস্ট গ্রুপ, বরগুনা অংশ নিয়ে সারাদেশের সিটিজেন জার্নালিস্টদের উৎসাহিত করেছিল নিঃসন্দেহে।

পাবনা
পাবনাবাসীর মাঝে ইছামতির বুকে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন তৈরী করা, অবৈধ দখলদারদের উপর মানসিক চাপ তৈরী করা এবং অপরিকল্পিত নীচু ব্রিজগুলো অপসারণে জনমত তৈরী করার তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে হঠাৎ করেই জেলা প্রশাসক, নাটোর মহোদয় এক অভিনব নৌ-র‌্যালির আয়োজন করেন গত ২২ আগষ্ট।কয়েক হাজার মানুষ এতে অংশ নেয়। জেলা প্রশাসক জনাব রেখা রানী বালো নদী-খাল পুনরুদ্ধারে জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধিতে নতুন একটি উদ্ভাবনী মাত্রা যোগ করলেন ইছামতি নদীতে নৌ-র‌্যালি করে।

নাটোর
জেলা প্রশাসন নাটোরের নারদ নদ উদ্ধার কর্মসূচীর অংশ হিসাবে গত ২০ জুলাই, ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ তারিখ পৌর এলাকার মহাশ্বশান ঘাট সংলগ্ন স্থান থেকে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়েছে। নারদ নদ পরিস্কার ও প্রবাহমান করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণের সহায়তা কামনা করেন জনাব শাহিনা খাতুন, জেলা প্রশাসক, নাটোর। উল্লেখ্য দখল ,দূষণ, কল কারখানার দূষিত বর্জ্য  এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অপরিকল্পিত রাস্তা কালভার্ট নির্মাণে নারদ নদের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।। টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটি, নাটোর শাখার উদ্যোগে কুইক সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। নাটোর শহরের বিভিন্ন এলাকার ২৪২ জন সাধারণ জনগনের মধ্যে জরিপ পরিচালনা করা হয়। সার্ভে রিপোর্টে দেখা যায় নারদ নদ রক্ষায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ৯৫.৮৭%, নেতিবাচক বলেছেন ২.৯০% এবং মন্তব্য করেন নি ১.২৩%।

ঝালকাঠি   
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মোঃ হামিদুল হক গত ২৫ আগষ্ট, ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ তারিখ শহরের অবৈধ দখলে থাকা খাল উদ্ধারের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। গত ২৮ আগষ্ট তিনি সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা দিয়েছেন অচিরেই শহরের খালগুলোর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ শুরু হবে। যারা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তাদের নিজ দায়িত্বে সেগুলো সরিয়ে নেবার নির্দেশও দিয়েছেন।

সিটিজেন জার্নালিজম ও নদী-খাল পুনরুদ্ধার
বরিশাল, টাঙ্গাইল এবং বাগেরহাটের সফল তিনটি অভিযানেই সিটিজেন জার্নালিস্টদের সক্রিয় অংশগ্রহন ছিল। এমনকি এক জেলার সিটিজেন জার্নালিস্টরা অন্য জেলায় গিয়েও অংশ নিয়েছে। যে চারটি জেলা নদী-খাল পুনরুদ্ধারে সফলতার পথে আছে তার মধ্যে নাটোর ছাড়া সর্বত্রই সিটিজেন জার্নালিস্টরা অত্যন্ত সক্রিয়। জেলা প্রশাসন, নাটোর সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপ খোলার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

সম্ভাব্য অভিযান (জেলা)
১। ঢাকা জেলার বুড়িগঙ্গা নদী
২। ঠাকুরগাঁও জেলার পাথরাজ নদী
৩। সিরাজগঞ্জ জেলার হুরাসাগর নদী
৪। চট্টগ্রাম জেলার চাক্তাই খাল
৫। বগুড়া জেলার করতোয়া নদী
৬। গাইবান্ধা জেলার ঘাঘোট নদী
৭। রংপুর জেলার শ্যামাসুন্দর খাল
৮। পাবনা জেলার চিকনাই নদী
৯। নারায়ণগঞ্জ জেলার পঙ্খীরাজ খাল
১০। ঝালকাঠি জেলার ধাঁনসিড়ি নদী ও সাংগর খাল
১১। বরগুনা জেলার চাওড়া/সুবন্ধী খাল
১২। বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার আমতলী খাল
১৩। টাঙ্গাইল জেলার সদর উপজেলার শ্যামাবাবুর খাল
১৪। বরিশাল জেলার নাপিতখালি খাল
১৫। বরগুনা জেলার বেতাগীর খাল
১৬। বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার হুমার খাল
১৭। ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার বাগড়ি থানা ঘাটের খাল

অবৈধ দখলে অত্যাচারে অতিষ্ঠ নদী-খাল সব জেলাতে নাও থাকতে পারে। যেমন রাজশাহী। আমার জানামতে উপরের জেলাগুলোতে উল্লেখিত নদী-খাল পুনরুদ্ধারের কাজ করার সুযোগ আছে। এর বাইরে যেসব জেলায় এধরণের কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন আছে সেগুলো জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো। আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরী করার উদ্দেশ্যেই এই লেখা।

Categories: উদ্ভাবন