আজ- শনিবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৭ ইং, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       বন্যার্তদের জন্য দান নয় ঋণ শোধের আয়োজন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে

৩ সেপ্টেম্বর, ঈদুল আযহার পরের দিন, রাতে বরগুনা মাছ বাজার থেকে দুটি ইলিশ মাছ কিনেছিলেন অ্যাড: নাজমুল আহাসান সোহেল। মাছ দুটির ওজন ছিল ২ কেজি ২০০ গ্রাম। প্রতি কেজি ১১০০ টাকা। মাছ দুটি বাসায় নিয়ে কাটার সময় এর পেটে বড় সাইজের লোহার রড পাওয়া যায় যার ওজন প্রায় ২৫০ গ্রাম।বিষয় হলো ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ৬০০ টাকা হলেও ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম প্রায় দ্বিগুণ ১১০০-১২০০ টাকা। দ্বিগুণের লোভেই এই গুনাহ। এছাড়াও এই বাজারের মাছ ব্যবসায়ীদের জুয়া ও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে বলে শোনা যায়।

৪ সেপ্টেম্বর অ্যাড: নাজমুল আহাসান সোহেল বরগুনার বিশিষ্ট সিটিজেন জার্নালিস্ট জনাব মুশফিক আরিফকে বিষয়টি ফোনে জানান। জনাব মুশফিক তাঁকে ফেসবুকে ছবিসহ পোস্ট দিতে বলেন। এরপর জনাব মুশফিক ফেসবুকের ‘সিটিজেন’স ভয়েস-বরগুনা’ গ্রুপে একটি পোস্ট দিয়ে জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন দুপুর দেড়টার দিকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বরগুনার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ নুরুজ্জামান মহোদয় কমেন্ট করেন We will take action soon।এই soon অর্থ যে ৩ ঘন্টা এটা বোধহয় কেউ ভাবতেও পারেনি। এরপর সাথেসাথেই জেলা প্রশাসক মহোদয় নিজেও একটি পোস্ট দেন ‘‘দ্রুতই নেয়া হবে আইনী ব্যবস্থা। মাছ-সব্জী বাজারের অনিয়ম নিয়ে একটা নাগরিক শুনানীর আয়োজনও করা হবে শীঘ্রই’’।

মানুষ অন্য মহাদেশে গিয়েও যেমন তার শৈশবের স্কুলকে ভুলকে পারেনা তেমনি জেলা প্রশাসকগণও সম্ভবত সেই জেলাকে ভুলতে পারে না। দুঃখজনকভাবে প্রত্যাহৃত হবার পরেও সাবেক জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ বশিরুল আলমকে তাই কয়েক মিনিটের মধ্যে কমেন্ট (এখনি এই অভিনব প্রতারণার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনকে কঠোর আইনী ব্যবস্হা নিতে হবে) করতে দেখা যায় যা সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমান জেলা প্রশাসকও জানিয়ে দেন ‘‘স্যার, এখনই অভিযোগ দিতে বলেছি। মোবাইল কোর্টের প্রস্তুতি চলছে’’। সাবেক জেলা প্রশাসক মহোদয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন ‘‘কয়েক বছর আগে চিংড়ীর ভেতরে লোহার কুচি, সাগু দানা ইত্যাদি ভরে ওজন বৃদ্ধি করে রপ্তানি করা হতো। EU সহ অন্যান্য দেশ প্রতারণাটি ধরতে পেরে চিংড়ী আমদানী বন্ধ করে দেয়। আগামীতে বরগুনার ইলিশ বিদেশেও রপ্তানী হবে। কাজেই এসব প্রতারনা বন্ধ করতে হবে এখনই’’।

জেলা প্রশাসকের পরামর্শে সিটিজেন জার্নালিস্ট মুশফিক ৪টার দিকে ক্রেতা এ্যাড. নাজমুলকে নিয়ে মাছ বাজারে যান এবং ঐ মাছ ব্যবসায়ীকে খুঁজে বের করেন।শুধু খুঁজে বের করাই নয় তাকে চোখে চোখে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।সেইসাথে মাছ ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধ সামাল দেবার কাজটিও করতে হয়।

এদিকে জেলা প্রশাসক পুলিশ প্রশাসনের সাহায্য চান এবং জনাব প্রমথ রঞ্জন ঘটক রিপনকে দায়িত্ব দেয়া হয় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে।মাছ ব্যবসায়ী কামাল প্রথমে অস্বীকার করলেও জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে দোষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ম্যাজিস্ট্রেট তাকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন -২০০৯ অনুযায়ী ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন। ঘড়িতে তখন সাড়ে চারটা বাজে।

Citizen’s Voice–Barguna ফেসবুক গ্রুপে মুশফিক আরিফ (মাছরাঙ্গা টিভির সাংবাদিক) ছাড়াও কয়েক ডজন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক নিয়মিতভাবে কাজ করে নতুন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। এর একটি বড় কারণ সম্ভবত তাঁরা বুঝতে পেরেছেন প্রথাগত সাংবাদিকতার চেয়েও সিটিজেন জার্নালিজম অনেক ক্ষেত্রে বেশী শক্তিশালী। সেখানে দেশের কয়েকটি স্থানের মতো জার্নালিস্টদের সাথে সিটিজেন জার্নালিস্টদের বিরোধ নেই বললেই চলে। এই কৃতিত্বটি নিঃসন্দেহে বরগুনা জেলা প্রশাসনের। তাছাড়া জনাব মোঃ নুরুজ্জামান নিজেও সোশাল মিডিয়ায় এ্যাকটিভ এবং নিরন্তর সিটিজেন জার্নালিস্টদের উৎসাহ প্রদান করে থাকেন। অনেকের বিরোধিতার কারণে সোশাল মিডিয়ার শক্তিকে পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না এই দুঃখবোধটিও তাঁর মধ্যে কাজ করে। মাত্র কয়েকদিন আগের মাতৃবিয়োগের বেদনাকে বুকে নিয়ে ঈদের পরে প্রথম কর্মদিবসে অবহিত হবার কয়েক ঘন্টার মধ্যে কর্মতৎপরতা ও সিটিজেন জার্নালিস্টদের সহযোগিতার যে নজির তিনি স্থাপন করলেন তা মনে রাখার মতো।

বরগুনায় সিটিজেন জার্নালিস্ট ও জেলা প্রশাসনের চমৎকার বোঝাপড়ার ৩ ঘন্টার একটি সফল মঞ্চায়ন দেখল দেশবাসী। একথা বলতেই হবে বর্তমানে দেশের জেলা প্রশাসন সমূহে সিটিজেন জার্নালিজম চর্চার উজ্জ্বলতম কর্মকর্তা বরগুনার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ নুরুজ্জামান এবং উজ্জ্বলতম সিটিজেন জার্নালিস্ট জনাব মুশফিক আরিফ। এই যুগলের আরো সাফল্য নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছে আছে। সিটিজেন জার্নালিজমের আপাত স্থবির সময়ে অন্যদের উৎসাহিত করতে সেটার প্রয়োজনও আছে।

Categories: সিটিজেন জার্নালিজম