আজ- শনিবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৭ ইং, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       বন্যার্তদের জন্য দান নয় ঋণ শোধের আয়োজন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত

স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে বঙ্গবন্ধুর বিকৃত ছবি ছাপানোর অভিযোগ এনে আগৈলঝাড়ার সাবেক ইউএনও জনাব তারিক সালমনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয় গত ৭ জুন। পাঁচ কোটি টাকার মানহানির মামলাটি করেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ওবায়েদ উল্লাহ সাজু। বিষয়টি তখন এতোটা আলোচনায় আসেনি।কিন্তু আলোচনায় আসার জন্যই মামলাটি করা হয়েছিল বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। এই ভদ্রলোক ‘শিশুর আঁকা জানলে মামলা করতাম না’, ‘গাছের নীচে কয়েকটি শিশু খেলছে’ এমন আরো কিছু মন্তব্য করে, হৃৎকম্পের কথা বলে লোক হাসিয়ে, ধর্ম সম্পাদকের পদ হারিয়ে, মামলা প্রত্যাহার করে এখন ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গন্য হলাম’ গান শুনছেন। বোঝা গেল বাংলাদেশের মানুষ ‘ভি’ (v) দেখানো পছন্দ করে না। মোল্লা, উল্লাহ কারোটাই না।

বরিশাল মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের (সিএমএম) বিচারক মো. আলী হোসাইন মামলাটি আমলে নিয়ে সমন জারি করে ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। সে মোতাবেক নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ১৯ জুলাই  জামিন প্রার্থনা করা হলে আদালত প্রথমে জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সাথে সাথে বিষয়টি এমনভাবে আলোচনায় উঠে আসে যে দুই ঘণ্টা পর জামিন মঞ্জুর করেও তা থামানো যায়নি। জামিনযোগ্য ধারায় ইউএনও পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার জামিন মঞ্জুর না হওয়াটা নজীরবিহীন। লঞ্চের টিকেট ও সার্কিট হাউজের ভাড়া নিয়ে যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোও অবশ্য নজীরবিহীন। মজার বিষয় হলো দুই ঘন্টার ব্যবধানে ভোজবাজির মতো সেই জামিন মঞ্জুর হয়ে গেল। আগে শুনেছি ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না’। এখন তো বিষয়টি ‘হুকুম নড়ে তো হাকিম নড়ে না’ হয়ে গেল। এখানে ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা’ গানটি বাজানো যেতে পারে।

ধন্যবাদ দিতে হয় সেই আইনজীবীকে (মোখলেছুর রহমান) যিনি সবাই প্রত্যাখ্যান করলেও ইউএনও সাহেবের জামিনের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। আর সেই পুলিশ সদস্যকে (এএসআই শচীন) যিনি অর্ধশত আইনজীবীর দাবীর মুখেও হ্যান্ডকাফ না পরিয়ে শুধু হাতের উপর ধরে রেখে এবং ফোন করার সুযোগ দিয়ে সম্মান দেখিয়েছিলেন।

এই ঘটনায় প্রথমে মামলার বাদী অ্যাডভোকেট ওবায়েদ উল্লাহ সাজুকে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে শোকজ করা হয়। এর পর আদালতে দায়িত্বরত ৬ জন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। বরগুনা ও বরিশালের দুই ডিসিকেও প্রত্যাহার করা হয়। বদলী করা হয় বরিশালের ডিআইজি ও এসপিকে। এরপর মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জাজকেও বদলী করা হবে হয়তো। সর্বশেষ মামলার বিবাদীকে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে বদলী করা হলো। বরিশাল, বরগুনা এমনকি খোদ রাজধানীর  উপর দিয়ে দুই সপ্তাহব্যাপী ঝড় বয়ে যাচ্ছে যেন। ঝড়ে দুভাবে গাছ উপড়ে পড়ে। ঝড়ের ঝাপটায় ও উপড়ে পড়া গাছের ধাক্কায়।

অনেকেই প্রশ্ন করছেন এই কান্ডটি যদি ইউএনওর সাথে না হয়ে সাধারণ একজন ক্যাডার বা নন ক্যাডার কর্মকর্তার সাথে হতো তাহলে কি দুঘন্টায় বা দুদিনে সবকিছু এভাবে বদলে যেত? হয়তো যেত, হয়তো যেত না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা গত কয়েক বছর ধরে সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন চর্চার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে এই ঘটনাটি তার উপর একটি প্রচন্ড আঘাত। একজন ইউএনওকেই যদি এরকম অমূলক মামলায় নাজেহাল হয়ে মনের দুঃখে চাকরী ছেড়ে দেবার কথা ভাবতে হয় তাহলে মাঠ পর্যায়ের আরো নীচের স্তরের কর্মকর্তাদের নতুন কিছু করার ঝুঁকি না নিয়ে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। আর বরিশালের ডিসিকে প্রত্যাহার করার সাথে সাথে সেখানে সিটিজেন জার্নালিস্টদের যেভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে তাতে দেশ জুড়েই সিটিজেন জার্নালিজম থমকে যাবার সম্ভাবনা আছে। কোনো সিটিজেন জার্নালিস্ট যদি অন্যায় কিছু করে থাকে সেটির সমালোচনা বা বিচার হতে পারে। কিন্তু কেউ আর সিটিজেন জার্নালিস্ট পরিচয় দিতে পারবে না এই আব্দার কেন? কিছু অসাধু সাংবাদিকের জার্নালিস্ট পরিচয় দিয়ে সুবিধা পাওয়া ও রোজগারের পথকে নিষ্কন্টক করার জন্য?

তবে আশার কথা হলো সোশাল মিডিয়ার শুভ শক্তি আরো একবার প্রমাণিত হলো।

লেখকঃ ড. মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব, প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Categories: আপনাদের লেখা