আজ- রবিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ৮ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       বন্যার্তদের জন্য দান নয় ঋণ শোধের আয়োজন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস       দেশের প্রথম ‘স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং’ সম্মেলন       আদালতের ভ্রমণ বর্জন       আবহাওয়া অধিদফতরের এ্যাপে বজ্রপাতের পূর্বাভাস ও করণীয়       WSIS Prizes 2017 এ ভোট দেয়ার ৭ টি দাপ্তরিক নজির       RMP’র মাদক ও জঙ্গী বিরোধী উদ্ভাবন ও অন্যান্য    

শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়

যার কেউ নেই কিংবা থেকেও নেই তার নাম মরিয়ম নেছা, বয়স সম্ভবত ৯০। সন্তানদের অবহেলায় তাঁর স্থান হয়েছে গোয়ালঘরে। সেখানে রাতের বেলা শিয়াল কামড়ে তাঁর পায়ের মাংস খেয়ে ফেলেছে। যে দেশের মানুষ কবরের উপর খেজুরের ডাল রেখে আসে যেন শিয়াল মৃতদেহকে না কামড়ায় সেদেশে সম্তানের বাড়িতে জীবিত মায়ের মাংস শিয়াল কামড়ে নিয়ে যাচ্ছে এটি জনরোষ সৃষ্টি না করে পারে না। এখন তাই সোশাল মিডিয়ার কামড়ে সন্তানদের গায়ের মাংস যাবার যোগাড়। তবে এটুআই, সমাজসেবা অধিদফতর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং জন প্রতিনিধিগণ যেভাবে এগিয়ে এসেছেন তা দেখে তেজপাটুলি গ্রামের মানুষের মনে হচ্ছে – যার কেউ নেই তারও সোশাল মিডিয়া আছে।

শিয়ালের কামড়ের গল্প
ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের তেজপাটুলি গ্রামের মৃত মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী তিনি। স্বামী বেঁচে নেই কিন্তু ৫ সন্তান বেঁচে আছে। এই বৃদ্ধা মানুষের বাড়িতে কাজ করে বড় ছেলেকে মেট্রিক পাশ করিয়েছেন। সেই ছেলে মোখলেছ স্ত্রী সন্তান নিয়ে এখন থাকেন একই ইউনিয়নের বেড়িবাড়ি গ্রামে। মেজ ছেলে মোবারক বিয়ে করার পর মাকে রেখে চলে গেছেন মুক্তাগাছা উপজেলার কাঠবল্লা গ্রামে। স্বামীর ভিটায় নিজের বসত ঘর না থাকায়, ছোট ছেলে মারফতের ঘরের বারান্দায় থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছিলেন অনেক দিন ধরে।

অশীতিপর মরিয়ম নেছার কপালে জোটেনি বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতা এমন কি সরকারের কোন সুযোগ সুবিধা। দুঃখের বিষয় হলো স্থানীয় চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশে থেকেও কোনো ভাতার জন্য তিনি বিবেচিত হননি। অসুস্থ্য শরীর নিয়েই আশপাশের বাড়ি থেকে ভিক্ষা করে খাবার সংগ্রহ করতেন। বছর খানেক ধরে থেকে ভিক্ষাবৃত্তিও করতে পারেন না। সন্তানেরাও তেমন খোঁজ খবর নেয় না। শেষে বৃদ্ধা মায়ের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছিল তার তিন সন্তান। প্রত্যেক সন্তানের বাড়িতে বৃদ্ধা মা ৩ মাস করে থাকবেন। বড় ছেলের বাড়িতে আড়ই মাস থাকার পর তাকে রেখে আসা হয় মেজ ছেলের বাড়িতে। মেজ ছেলে ২-৩ দিন রাখার পর তাকে রেখে যান ছোট ছেলের বাড়িতে, তেজপাটুলী গ্রামে। ছেলের ঘরে ঠাঁই হয় না। ঠাঁই হয় ছেলের ঘরের বারান্দায়। অসুস্থ্য ও বয়সের ভারে প্রকৃতির কাজ সারেন বারান্দায়।কখনো বিছানায়। সে জন্যই ছেলে ও তার স্ত্রী গত সপ্তাহে অসুস্থ্য বৃদ্ধা মা’কে ভাঙ্গা গোয়াল ঘরে গরুর পাশে রেখে আসে! গরুর জন্য সেখানে মশারি থাকলেও বৃদ্ধা মায়ের জন্য শুধু প্লাস্টিকের বস্তা ও ছেড়া কাঁথা! এলাকাবাসী জানায়, গত বুধবার রাতে গোয়াল ঘরে অসুস্থ্য বৃদ্ধাকে শিয়ালে কামড়ালেও তাঁর কান্নায় ঘর থেকে কেউ উঠে আসেনি। একই রাতে দ্বিতীয় বার যখন শিয়াল কামড়ায় তখন বৃদ্ধার চিৎকারের আশপাশের বাড়ি থেকে মানুষ উঠে এসে তাঁকে রক্ষা করে। ততক্ষণে শিয়াল বৃদ্ধার পায়ের মাংস অনেকটা কামড়িয়ে খেয়ে ফেলে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় বৃদ্ধা বারবার একই কথা বলছেন, ‘বাজান আমার ভালা কইরা চিকিৎসা করাও, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে’ তারপরও নিষ্ঠুর সন্তানের মন গলছে না। বৃদ্ধার ছোট পুত্র মারফত আলী বলেন, শুক্রবার কাজ (দিনমুজরী) করে আসছি পশ্চিম থেকে। টাকার জন্য চিকিৎসা করতে পারছিনা। গোয়াল ঘরে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ঘরের বারান্দায় প্রশ্রাব পায়খানা করার কারণেই ২/৩ দিন যাবৎ তিনি নিজেই গোয়াল ঘরে চলে যান। ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও মেডিকেল অফিসার ডাঃ হারুন আল মাকসুদ বলেন, শিয়ালের কামড়ে আহত বৃদ্ধা মহিলাকে দ্রুত চিকিৎসা করানো না হলে জলাতংক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পুনর্বাসনের গল্প
ফুলবাড়িয়ার উপজেলা নির্বাচন অফিসার জনাব সানিয়াজ্জামান শামীম ২৮ মে, ২০১৭ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ‘পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপে বিষয়টি পোস্ট করেন।

ঘন্টা খানেকের মধ্যে এটুআই এর ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট জনাব মানিক মাহমুদ সমাজসেবা অধিদফতরের ডিজির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

মোটামুটি ১ ঘন্টার মাথায় ডিজি মহোদয় ডিডিকে নির্দেশ দেন ‘আজই ঐ মাকে হাসপাতালে ভর্তি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্হা নিন। এরপর তাঁর ভাতা, আমাদের শান্তি নিবাসে জীবনকালের জন্য সরকারী সুবিধের আওতায় তাঁর আবাসন সহ সব ধরণের সুবিধে নিশ্চিত করা হবে যাতে তিনি জীবনের বাকী দিনগুলো যথাযথ মর্যাদার সাথে নিবিড় নিরাপত্তা আর শান্তিতে পার করতে পারেন’।

আড়াই ঘন্টা পরে রাত ১১টার দিকে ডিডি, সমাজসেবা জানান ‘রাত ৯.৩০টায় Gazi Kabir Sir এর ফোন পেয়েই ফুলবাড়িয়ার দুজন ইউনিয়ন সমাজকর্মীকে পাঠাই। সেখানে চেয়ারম্যান এর সাথে যোগাযোগ হয় এবং ইনজেকশন দেয়া হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা এবং ভাতার ব্যবস্থা করা হবে ইনশাল্লাহ।

রাত ১২টায় ডিজি মহোদয় পুণরায় কমেন্ট করেন ‘হাসপাতালে ভর্তি করার পর হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যক্রমের আওতায় ঔষধ, পুষ্টিকর খাবার, এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রবর্তিত বয়স্কভাতা প্রাপ্য বকেয়া সমেত পৌছে দেবেন’।

২৯ মে রাতে ডিডি, সমাজসেবা, ময়মনসিংহ কমেন্ট করে জানান ‘মরিয়ম নেছাকে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ময়মনসিংহ এসকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বয়স্ক ভাতার বহিও দেয়া হয়েছে। সুস্থ্য হবার পর সমাজসেবার শান্তি নিবাসে তাঁকে বাকী জীবন রাখা হবে।

উল্লেখ্য যে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ডিজি মহোদয়ের মুকুটে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহনের আরও একটি পালক যুক্ত হলো। এমন শতাধিক পালক শোভিত মুকুটের ভার পরবর্তী ডিজিও বহন করতে পারবেন আশা করি।

দৃষ্টি আকর্ষণ ও মন্তব্য
জনাব মানিক মাহমুদ প্রথম সমাজসেবা অধিদফতরের ডিজির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট Nazmanara Khanum জেলা প্রশাসক, মংমনসিংহের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যুগ্ম সচিব Shabiha Pervin ইউ এন ও ফুলবাড়িয়া ও ডিসি ময়মনসিংহ-এর দৃস্টি আকর্ষণ করেন। Additional Deputy Commissioner, Mymensingh জনাব Muhammad Abdul Latif ইউএনওর সাথে কথা বলেন। জনাব Barkat Nuri সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে সোশার মিডিয়ায় পেস্টের জন্য অপেক্ষা না করে একটি ডাটাবেজ তৈরীর উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সমাজসেবা অফিসার, শিবচর, মাদারীপুর ‘আপদকালীন সেবা’ নামে নতুন কর্মসূচির আওতায় উপজেলায় বরাদ্দ প্রদান করা যায় কিনা এমন একটি প্রস্তাব রাখেন।  ফুলবাড়িয়ার উপজেলা নির্বাচন অফিসার জনাব Md Shaniazzaman,  যিনি সোশাল মিডিয়ায় পোস্টটি শেয়ার করেছিলেন তিনি এক পর্যায়ে কমেন্ট করেন ‘এত চমৎকার সাড়া পাওয়া যাবে ভাবতেও পারিনি’।

ঘটনাস্থলের গল্প
২৯ মে সকালে ফুলবাড়ীয়ার ইউএনও লীরা তরফদার ছুটেযান বৃদ্ধা মরিয়ম নেছার বাড়িতে। এ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে নিয়ে এসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। সেখানে তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব মোসলেম উদ্দিন হাসপতালে দেখতে যান অসুস্থ্য মরিয়ম নেছাকে। তিনি নগদ অর্থ প্রদান, চিকিৎসা ও পরবর্তী সকল দায়িত্বভার নেয়া ঘোষণা দেন। এসময় বয়স্ক ভাতার কার্ড, এমপি, ইউএনও, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, স্থানীয় সাংবাদিকসহ আরো কয়েকজনের নগদ অর্থ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ময়েজ উদ্দিন তরফদারের হাতে তুলে দেয়া হয়। দুপুরে আসেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহামেদ মুক্তি। ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, বৃদ্ধার ঘটনাটি জানার পর রবিবার রাতে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি।

৩০ মে রাতে ডিডি, সমাজসেবা জানান ‘আজ পরিচালক, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মহোদয়ের আগ্রহে বেগম মরিয়ম নেছাকে এসকে হাসপাতাল থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে নিয়ে আরো ভালোভাবে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচেছ আর হাসপাতাল সমাজসেবা অফিস থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ করা হচেছ। মরিয়ম নেছার বর্তমান অবস্থা আগের চেয়ে ভাল’।

সোশাল মিডিয়ার কামড়ের গল্প
খবরটি প্রথম একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও বিষয়টি ভাইরাল হয় সোশাল মিডিয়ায়। সমাজসেবা অধিদফতরের ডিজি জনাব গাজী কবির ২৯ মে দুপুর সোয়া ১২ টায় ফেসবুকে কমেন্ট করেন ‘টেলিফোনিক আলোচনা অনুযায়ী (এবিষয়ে ইউএনও ফুুলবাড়িয়ার সাথেও কথা হয়েছে) অতি সত্বর মরিয়ম নেছার দায়ী সন্তানদের বিরুদ্ধে মাতা পিতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ ‘র সংস্হানের আওতায় মামলা দায়ের করার ব্যবস্হা নিয়ে গ্রুপে শেয়ার করুন’। এডিএম, বাগেরহাট জনাব Mominur Rashid Momin শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের বিষয়ে মন্তব্য করেন। ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ কবিরুল ইসলাম বলেন, বৃদ্ধার ছেলেদের মধ্যে মোখলেছ বাড়িতে থাকতেন। এই ন্যক্কারজনক খবর জানাজানির পর তিনি জনরোষে পড়েন। এ ছাড়া সন্তান হিসেবে মায়ের প্রতি অবহেলার কারণে ৩০ মে দুপুরে ১৫১ ধারায় পুলিশ বাদী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তবে শিয়ালের আগেই যদি সোশাল মিডিয়ার কামড় দেবার কোনো ব্যবস্থা করা যায় তাহলে আরো ভাল হবে বলে অনেকে মত প্রকাশ করেছেন। তবুও ভাল লাগছে দেখে – যার কেউ নেই তারও সোশাল মিডিয়া আছে।

পুনশ্চঃ অভাবনীয় বিষয় হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই অসহায় মায়ের সকল দায়িত্ব গ্রহন করেছেন।

Categories: সিটিজেন জার্নালিজম