আজ- রবিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ৮ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       বন্যার্তদের জন্য দান নয় ঋণ শোধের আয়োজন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস       দেশের প্রথম ‘স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং’ সম্মেলন       আদালতের ভ্রমণ বর্জন       আবহাওয়া অধিদফতরের এ্যাপে বজ্রপাতের পূর্বাভাস ও করণীয়       WSIS Prizes 2017 এ ভোট দেয়ার ৭ টি দাপ্তরিক নজির       RMP’র মাদক ও জঙ্গী বিরোধী উদ্ভাবন ও অন্যান্য    

আদালতের ভ্রমণ বর্জন

গত ১১ মে, ২০১৭ তারিখ হাইকোর্ট কর্তৃক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা সংক্রান্ত ২০০৯ সালের আইনের ১৪টি ধারা ও উপধারা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের উপজেলায় অবস্থান করে সার্বক্ষণিক (রাত বিরাতেও) বিচারিক সেবা দেয়া অত্যন্ত দুরুহ এবং বাস্তবায়ন যোগ্য নয়। অন্তত এই মুহুর্তে। কাজেই মানুষের কাছে মনে হচ্ছে হাইকোর্ট আসলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বন্ধ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে ভ্রাম্যমাণ আদালতই বন্ধ করে ফেলেছে। এজন্যই লেখার শিরোনাম আদালতের ভ্রমণ বর্জন। এর আগে ঢাকার বাইরে ৬টি জেলায় হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করার বিষয়টিও বর্জিত হয়েছিল। আশার বিষয় হলো সুপ্রিমকোর্ট রায়টি স্থগিত ঘোষণা করেছেন।

এসব বর্জনের বিপরীতে আদালতের অর্জন বা অবস্থাটি একটু দেখে নেয়া যাক। গত ১৭ জুলাই মাননীয় আইনমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছিলেন, “২০১৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৩১ লাখ ৯ হাজার ৯৬৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।” অন্যদিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে গত সাত বছরে বিভিন্ন প্রকৃতির ৮ লক্ষাধিক অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ৩ লাখ ৬২টি কোর্ট পরিচালনা করা হয় এ সময়ে। এছাড়া ৮ লাখ ২০ হাজার ৭৩১টি নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগের সূত্রে ২০৮ কোটি ৩৭ লাখ ৫২ হাজার ৪১২ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

গত ২৭ মে রাজধানীর ইস্কাটন রোডে অবস্থিত বিয়াম ফাউন্ডেশন অডিটোরিয়ামে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাঃ জননিরাপত্তা ও সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে- “গত ২০১৫ সালে এক বছরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫৪ জনকে কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে এবং ৩৭ কোটি ৩৭ লাখ ৮৮ হাজার ২৪৬ টাকা আদায় করা হয়েছে। ৫৭ হাজার ১৫৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭ টি মামলার নিষ্পত্তি করা হয়।” অর্থাৎ মোবাইল কোর্ট না থাকলে এবং আইন শৃংখলা পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থায় রাখতে আরো প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার মামলা নিম্ন আদালতকে পরিচালনা করতে হতো শুধু ২০১৫ সালেই। ২০১৫ সালে কোর্টের মাধ্যমে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যাটি জানতে পারলে অবশ্য তুলনা করতে সুবিধা হতো।

আদালতের রায় মানতেই হবে, তবে বিষয়টি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এবং এতে মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষ ও সরকারী স্বার্থ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাই মাঠের অভিজ্ঞতার আলোকে সামগ্রিক বিষয়টি পর্যালোচনা করার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করি।

মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম সামগ্রিকভাবে বিচারিক কার্যক্রম কিনা সেটা আদালত বিবেচনা করবে। তবে তৃণমূল পর্যায়ে যে প্রক্রিয়ায় মোবাইল কোর্টকে প্রয়োগ করা হয় সেই প্রক্রিয়াটি যতটা না বিচারিক তার চেয়ে বেশি নির্বাহী প্রকৃতির। মূলত মোবাইল কোর্ট আইনটিও সামগ্রিক পৃথকীকরণ নীতির উপর ভিত্তি করেই প্রস্তুত করা হয়েছিলো। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর ৭(৪) ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি কেবল দোষ স্বীকার করলেই তাকে দন্ড প্রদান করা যায়। ফলে বিচারিক প্রক্রিয়া সামান্যই জড়িত এর সাথে। মোবাইল কোর্টে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ নেই বলা হয়। কিন্তু মোবাইল কোর্ট আইনে তাৎক্ষণিক আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। সীমাবদ্ধতা বলতে এখানে কেবল কোন উকিল নিয়োগ দেবার স্বাধীনতা অপরাধীর থাকে না। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ যখন মোবাইল কোর্ট করবে তাঁরাও আইনজীবীর সহায়তা প্রদান করতে পারবেন না।

কিন্তু বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর কিভাবে নির্বাহী বিভাগের একজন প্রতিনিধি বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন? ব্যাখ্যায় যাবার আগে আলোচনা করে নেয়া যাক আমাদের দেশের অপরাধ সংস্কৃতির ধরণ ও বাস্তবতা নিয়ে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে মোবাইল কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করাকে অনেকে মোবাইল ফোন অবৈধ ঘোষণা করার মতো সমস্যাসঙ্কুল মনে করছেন নীচের ২৫টি কারণে।
(১) বাল্য বিবাহঃ বাল্য বিবাহের মূল ক্ষেত্র পল্লী এলাকা আর সুবিধাজনক সময় হচ্ছে মধ্যরাত ও শুক্রবার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ত্বরিত গতিতে বিবাহস্থলে উপস্থিত হয়ে বাল্য বিয়ে বন্ধ করতে হয়। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটগণ উপজেলা পর্যায়ে থাকেন না বিধায় দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়া সম্ভব হবে না। আর সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ থাকার ফলে ত্বরিত গতিতে তাদের পক্ষে খবর পাওয়াও সম্ভব নয়। আবার হিন্দু বিয়ে যেহেতু একবার সংগঠিত হলে বাতিল হয় না ফলে বাল্য বিবাহ সংগঠণকারী হয়ত অপরাধের জন্য শাস্তি পাবেন কিন্তু তাতে বাল্য বিবাহ রোধ করা সম্ভব হবে না।
(২) ইভ টিজিং বা যৌন হয়রানীঃ যৌন হয়রানীর ব্যাপকতা রোধ করার ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের ফল দেশবাসী হাতেনাতে পেয়েছিল। মহামারীর মতো ব্যাপক এ অপরাধ ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
(৩) মাদক নিয়ন্ত্রণঃ মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যহত হবে। বিশেষত মাদক ব্যবসায়ীগণ লাভবান হবে বলে আশংকা হয়।
(৪) সরকারী সম্পত্তি, খাস জমি জবর দখলঃ সরকারী জবর দখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ হবে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তয়ানের ফলে মাঠ প্রশাসন সরকারী সম্পদ উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না।
(৫) রাস্তার গাছ কর্তনঃ সরকারী গাছ রক্ষা করা কঠিন হবে। নিয়মিত গাছ কাটার মামলা হবে, অপরাধী শাস্তিও পাবে। কিন্তু মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে গাছ কাটার পূর্বেই যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত, সেটা সম্ভব হবে না।
(৬) অবৈধ বালু উত্তোলনঃ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণের হাতে মোবাইল কোর্ট না থাকলে এ সরকারী সম্পদ রক্ষা ব্যাহত হবে।
(৭) হাট-বাজারের জমি দখলঃ যে কোন জমি দখল বা জবর দখল সংক্রান্ত অপরাধ বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশে ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে প্রায় আশিভাগ অপরাধ জমি বা জমি থেকে উদ্ভূত। রাজস্ব প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হাতে ত্বরিত গতিতে ব্যবস্থা গ্রহণের কোন উপায় না থাকলে সমস্যা হবার কথা।
(৮) পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধঃ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তৎপড়তার কারণেই পরীক্ষার হলে বাহির থেকে নকল যোগান দেওয়ার তৎপরতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। পরীক্ষার হলের আশেপাশে মানুষের আনাগোনা কম হয়। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। কেননা, ফৌজদারী কার্যবিধি অনুসারে জরুরী আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের।
(৯) খাদ্য ভেজাল প্রতিকারঃ ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এই সমস্যা বর্তমান সমাজে ব্যাপক, ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়মিত অভিযানের ফলেই তা মহামারী রূপ নেয়নি।
(১০) ভোক্তা অধিকার রক্ষাঃ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ হওয়ায় ভোক্তা অধিকার হুমকিতে পড়বে। শহর থেকে শুরু করে একেবারে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে মোবাইল কোর্ট একটি ভরসার জায়গা।
(১১) পর্ণগ্রাফি নিয়ন্ত্রণঃ বিশেষত উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা পর্ণগ্রাফি নামক সামাজিক বাধির করাল গ্রাসের শিকার। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এই সামাজিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল অনেকাংশে।
(১২) জুয়াঃ জুয়া খেলা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয় সবসময়। বিশেষত জুয়া খেলা সংগঠিত হয় গভীর রাতে। এর সাথে জড়িত থাকে স্থানীয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা। মোবাইল কোর্ট না থাকলে জুয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।
(১৩) রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণঃ রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিংএর মূল দায়িত্ব পালন করে জেলা প্রশাসন। মোবাইল কোর্ট কার্যকর না থাকলে সাধারণ মানুষকে সমূহ বিপদে পড়তে হতে পারে।
(১৪) অবৈধ সমাবেশ প্রতিহতকরণঃ দাঙ্গা, হাঙ্গামা প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা না থাকায় অপরাধীদের হিংসাত্বক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বাধা থাকবে না।
(১৫) সড়ক নিরাপত্তা জোরদারকরণঃ বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা। মোবাইল কোর্ট না থাকায় সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।
(১৬) মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণঃ অবৈধ নোট ও গাইড বই নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
(১৭) বড় বিপদে পড়বে বিশেষায়িত সেবা সংস্থাগুলোঃ নানা বিশেষায়িত সেবা সংস্থা যেমন ওয়াসা, ডেসকো, সিটি কর্পোরেশন, বন্দর, বিআরটিএ, মেট্রোপলিটন পুলিশসহ নানা সংস্থা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন। তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় বিপদে পড়বেন। এসকল জায়গায় বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করাও সম্ভব হবে না কেননা তা মাজদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থি।
(১৮) এয়ারপোর্টে যাত্রী হয়রানী বন্ধঃ ভ্রাম্যমাণ আদালত বন্ধের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হবে এয়ারপোর্টের যাত্রী সকল। এয়ারপোর্টের বাইরের ট্যাক্সি, দালাল, ছিনতাইকারী থেকে শুরু করে এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা পর্যন্ত তটস্থ ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালতের জন্য, যার সুবিধা পাচ্ছিল লক্ষ লক্ষ প্রবাসী।
(১৯) নদী, খাল দখলমুক্তকরণঃ বরিশালের জেলখাল, টাঙ্গাইলের লৌহজং, বাগেরহাটের ভৈরব পুনরুদ্ধারের মতো জনগুরুত্বসম্পন্ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। পাবনার ইছামতি, গাইবান্ধার ঘাঘট, রংপুরের শ্যামা সুন্দর বগুড়ার করতোয়া প্রভৃতির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা ইতোমধ্যে থমকে গেছে।
(২০) জাটকা নিধন ও চিংড়িতে জেলি প্রয়োগঃ দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির পিছনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালতের ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। চিংড়ির ভিতরে জেলী পুশ করে মাছের ওজন বাড়িয়ে দেশে বিদেশে সুনাম ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টাকেও অনেকাংশে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
(২১) পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণঃ পলিথিনের শপিং ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে মোবাইল কোর্ট প্রশংসা কুড়িয়েছে।
(২২) খাদ্যে ফরমালিন প্রতিরোধঃ বিশেষ করে ফলে ও মাছে ফরমালিনের ব্যবহারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ট্রাক ট্রাক ফরমালিনযুক্ত আম ধ্বংস করার সফল উদাহরণ মানুষকে স্বস্তি দিয়েছিল।
(২৩) জেলা ও উপজেলা আইন শৃংখলা সভার কার্যকারিতাঃ উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদনে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা না থাকলে এসব সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবেনা।
(২৪) এসডিজি বাস্তবায়নঃ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা ব্যতিত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল(এসডিজি) এর বিভিন্ন লক্ষ্য যেমনঃ মান্সম্মত শিক্ষা (লক্ষ্য ৪), জেন্ডার সমতা (লক্ষ্য ৫), জলবায়ু গত পদক্ষেপ (লক্ষ্য ১৩), শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান (লক্ষ্য ১৬) ব্যাহত হবে বলে অনেকে মনে করেন।
(২৫) সিটিজেন জার্নালিজমঃ বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় দেশ জুড়ে সিটিজেন জার্নালিজমের যে প্রবাহ শুরু হয়েছিল তার মাধ্যমে সারাদেশের সিটিজেন জার্নালিস্টগণ নানাবিধ সামাজিক অসংগতি প্রশাসননের নজরে এনে,সেগুলোর সমাধান পেয়েছে। মূলত এটির মাধ্যমে প্রশাসন ও জনগণের মাঝে একটি সেতু বন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল।

তৃতীয় মাত্রার অপরাধ
বিশ্বের প্রত্যেকটি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী আইন তৈরী করে থাকে। অপরাধকে আইনের দৃষ্টিতে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: ফৌজদারী (ক্রিমিনাল) ও দেওয়ানী (সিভিল) অপরাধ। যুগ যুগ ধরে এসব অপরাধের বিচার চলে আসছে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এ দুই ধরণের অপরাধের বাইরে একটি তৃতীয় মাত্রার অপরাধ, সামাজিক অপরাধ (সোস্যাল ক্রাইম), ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে আমাদের সমাজে। একটি সমাজের মূল্যবোধ, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা যত হ্রাস পেতে থাকে, তত বাড়তে থাকে সামাজিক অপরাধের মাত্রা। ইভটিজিং (যা কিনা ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ বা আত্মহত্যার মত মারাত্নক পরিণতি ডেকে আনে), মাদকাসক্তি, খাদ্য ও ঔষধে ভেজাল দেয়া, সামাজিক নিপীড়ণ, পরিবেশ দূষণসহ অজস্র সামাজিক অপরাধ বেপরোয়াভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এসব সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে বর্তমান বিচার ব্যবস্থায় আসলে তেমন কার্যকরী কোন ব্যবস্থা নেই। একটি মেয়ে ইভটিজিং-এর শিকার হলে অভিভাবকরা আইনী প্রক্রিয়ায় যেতে চায় না মান-সম্মানের ভয়ে। একজন ভোক্তা তার ভোক্তা অধিকার আইনের সুরক্ষার কথা আসলে জানেও না। লক্ষ লক্ষ প্রবাসীরা বিমান বন্দরে লাঞ্চনার স্বীকার হয়েও ঈশ্বরের দরবারে বিচার জানিয়ে চলে আসে। এমন অস্থির সময়ে মোবাইল কোর্ট প্রচলিত আইনী কাঠামোর বাইরে গিয়েও (অবশ্যই আইনসম্মতভাবে) সামাজিক অপরাধ দমনের এক শক্তিশালী ও জন-নন্দিত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

প্রচলিত তিন ধরণের আদালত
মোবাইল কোর্ট একটি অপরাধ প্রতিরোধকল্পে গৃহীত ব্যবস্থা। সরকার মামলা জট কমাতে শুধু এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর মাধ্যমে পরিচালিত মোবাইল কোর্টকেই গুরুত্ব দিচ্ছে না গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গ্রাম আদালতকেও কার্যকর করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশে বর্তমানে তিন ধরণের বিচার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। একটি নিয়মিত আদালত বা জুডিশিয়াল বিচার ব্যবস্থা, আরেকটি প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যদের মাধ্যমে ঘটনাস্থলে অপরাধ আমলে গ্রহণ করে দোষ স্বীকারের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা। সর্বশেষ জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ছোটখাট অপরাধের বিচার করা। এর উদ্দেশ্য মূলত একটিই। আর তা হলো নিম্ন আদালতকে সহায়তা করা। বলাই বাহুল্য যে, এর প্রতিটি মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করা যায়। ধাপ পেরিয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরাই এই আপীল শুনে থাকেন।

বিভিন্ন দেশের উদাহরণ
আদালতকে সহায়তার বিষয়টি শুধূ আমাদের দেশে নয় খোদ বৃটেনেও ‘লে ম্যাজিস্ট্রেট’ নিয়োগ করা হয়। বৃটেনের ‘লে ম্যাজিস্ট্রেট’ হতে গেলে আইন পড়তেই হবে এরকম কোন বাধ্য বাধকতা নেই। ‘লে ম্যাজিস্ট্রেট’রা ছোটখাটো অপরাধের বিচার করে থাকেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে ৬ মাস থেকে এক বছরের কারাদন্ড দিতে পারেন। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটদের Justices of Peace বলা হয় যারা ক্রিমিনাল কোর্টের বিরাট অংশ জুড়ে আছেন। ফ্রান্সে নির্বাহী বিভাগের অধীন একটি প্রশাসনিক আদালত আছে। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামো অনেকটা একই। ভারতের বিচার বিভাগ স্বাধীন কিন্তু সেখানকার জেলা প্রশাসক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। পাকিস্তানে ২০০১ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ আলাদা করতে গিয়ে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বিলুপ্ত করে DCO বা District Co-Ordination Officer পদের প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ২০১৩ সালে The Code of Criminal Procedure 1898 সংশোধন করে পুনরায় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিভাগীয় কমিশনার পদ প্রবর্তন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞতার প্রশ্ন
সবশেষে আসে বিশেষজ্ঞতার প্রশ্ন। একজন নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট তো আইনের উপর কোন ডিগ্রি নিয়ে চাকুরীতে আসে না। তাহলে সে কিভাবে আইন প্রয়োগ করবেন? প্রশ্নটি খুবই যৌক্তিক। কিন্তু কথা হলো আমাদের সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রত্যেকটি স্তরেই কি স্পেসালাইজেশনের ব্যপারটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে? তা হলে তো দর্শন পড়ে কেউ ব্যাংকে চাকুরী করতে পারতো না। একজন বিসিএস (প্রশাসন) এ নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট মৌলিক আইন ও প্রশাসন সম্পর্কিত নানারকম উন্নত মানের প্রশিক্ষণ লাভ করে থাকে চাকুরী জীবনের শুরুতেই। তাই, আপাতত মামলাজট কমানো ও তাৎক্ষণিকভাবে অল্প পরিসরে কিছু অপরাধ আমলে নিয়ে তারা বরং বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সহায়কগোষ্ঠী হিসেবে কাজ করতেই পারে।

জনগণের উদ্বেগ
শুধু সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন পোস্ট লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় জনগণের মধ্যে চাপা উদ্বেগ কাজ করছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেদের মেবাইল কোর্ট অবৈধ হলে সেই কাজগুলো কিভাবে সম্পন্ন হবে, কিভাবে দ্রুততম সময়ে প্রতিকার পাওয়া যাবে সেগুলো মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়। আমার মনেহয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এবং এ বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তাঁদের জনগণের কাছে খোলাসা করা দরকার। বিশেষ করে যেখানে উপজেলা পর্যায়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কোন অফিস ও পদ নেই। আবার মাজদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাহী বিভাগের অধীনস্ত করা অসাংবিধানিক। সংবিধানের ৮(২) অনুচ্ছেদে বলা আছেঃ ‘সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে উল্লেখিত নীতিসমূহ আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য হইবে না৷’ সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগের ২২ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা নীতি হচ্ছেঃ ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন৷’ তাহলে মাজদার হোসেন মামলার মাধ্যমে কিভাবে সুপ্রিমকোর্ট নিম্ন আদালতের ফৌজদারীর একটা অংশ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করলো সেটা অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়।

রায়ের প্রভাব
ইতোমধ্যে রায়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব হলো না। এমন খবরও পাওয়া গেছে যে, ফরিদপুরে সরকারী জমি দখলে মোবাইল কোর্ট বন্ধ থাকায় প্রশাসন নীরব। চাঁদপুরে মুন্সি আজিম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে জেলা প্রশাসকগণ অভিযোগ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত নিষিদ্ধে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। জনাব এইচ টি ইমাম বলেছেন মোবাইল কোর্ট বন্ধ হওয়ায় ভেজাল কারবারীরা তৎপর হয়ে উঠেছে। বরগুনার ভাড়ানী খালের ধারে নতুন করে ঘর তুলতে শুরু করেছে অপদখলকারীরা। দিনাজপুর, রাজবাড়ি, সখীপুর, রাঙ্গুনিয়া, চন্দ্রঘোনা, খোকসা, লোহাগড়া, এবং ময়মনসিংহে মানববন্ধনও হয়েছে।

জরিমানা ও কারাদন্ড বলতেই যদি বিচার বিভাগের এখতিয়ারকে বুঝায় তাহলে নির্বাহী বিভাগের কার্য পরিধির পুনর্বিন্যাস করতে হবে। রেলওয়ে আইন ১৮৯০ এর ১২৯ ধারা এবং ১৩০ ক ধারায় রেলওয়ের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারীকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও তল্লাশী করার ক্ষমতা, মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর ১৫৯, ১৬০ ও ১৬১ ধারায় পুলিশ অফিসারকে দেয় বিচারিক ক্ষমতা, মেট্রোপলিটন আইনে পুলিশ কমিশনারের বিচারিক ক্ষমতা, RPO তে নির্বাচনকালীন প্রিজাইডিং অফিসারের ম্যাজিস্ট্রেসী, The Registration Act, 1908 এ সাব রেজিস্টারের বিচারিক ক্ষমতা, ট্যাক্স আইনে ট্যাক্স কর্মকর্তাদের দন্ড দেয়ার ক্ষমতা রহিত করতে হবে।

স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর হলেও যেহেতু বিচার বিভাগকে আলাদা করার মতো একটি সাহসী উদ্যোগ বাংলাদেশ সরকার নিতে পেরেছে, সেহেতু আরেকটু সময় নিয়ে কোন একদিন হয়তো বিচার বিভাগ সকল অপরাধ প্রবণতা কমাতে একটি বিশেষায়িত বিভাগ হিসেবে ঠিকই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। বিশ্বের প্রত্যেকটি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী আইন তৈরী করে থাকে। ২০০৯ সালে পাসকৃত মোবাইল কোর্ট আইনটি মানুষের কাছে অনেকটাই এটুআই এর স্লোগান ‘জনগণের দোরগোড়ার সেবা’ বা Service @ Doorsteps এর মতো ‘জনগনের দোরগোড়ায় বিচার’ বা Justice @ Doorsteps এর মতো। কাজেই একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে রাতারাতি পরিবর্তন না করে, বরং ধীরগতির একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা মোতাবেক টেকসই সংস্কারই গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে কাম্য। বিচারিক ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক না কেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে গেলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় নির্বাহী ক্ষমতার জায়গাটির ভীত দূর্বল করে দিলে প্রকৃতপক্ষে সরকারই দূর্বল হয়ে পড়বে বলে আশংকা হয়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তত্ত্বে ভুল নেই নিশ্চিত। কিন্তু নির্বাহী ক্ষমতার জায়গাটি ক্ষুন্ন করাটা কতটা সমীচীন হবে সে ভাবনার বিষয়টি উন্মুক্ত থাকা উচিৎ সব নাগরিকের কাছে।

কৃতজ্ঞতা ন্বীকারঃ
১। Bangladesh Administrative Service (https://www.facebook.com/bcs.administration.cadre/)
২। নাইমুজ্জামান মুক্তা, এটুআই
৩। মানিক মাহমুদ, এটুআই
৪। প্লাবন ইমদাদ, পিএইচডি গবেষক (সোশাল পলিসি), ফিনল্যান্ড
৫। নাজমুল ইসলাম রাজু
৬। www.banglanews24.com
৭। শিবলু মোশারফ
৮। শ্যামল সরকার
৯। আহমাদ ফায়সাল
১০। মোমিনুর রশিদ, এডিএম, বাগেরহাট

লেখক: মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব, প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Categories: আপনাদের লেখা