আজ- শুক্রবার, ১৬ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং, ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস       দেশের প্রথম ‘স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং’ সম্মেলন    

বাক্স সমাচারঃ প্রস্থান পথে প্রতিক্রিয়া পাত্র

সহজ বিষয়। অফিসে এসে আপনি যদি অসন্তুষ্ট হয়ে চলে যান তাহলে জানিয়ে যান। সন্তুষ্ট হলেও বলুন। না, মুখে মুখে না, একেবারে কাগজে কলমে।

অভিযোগ বক্স
অভিযোগ বক্স আইডিয়াটির সাথে আমরা অনেক আগে থেকেই পরিচিত। বিষয়টি কার্যকর এমন তথ্যের সাথে আমার এখনও তেমন পরিচয় হয়নি। অভিযোগ বক্সকে অনেকে একচোখা বলেন এজন্য যে, অভিযোগ জানতে চাইলে প্রশংসা জানার ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

তথ্য/অভিযোগ বক্স

আরএমপি কমিশনার জনাব মোঃ শফিকুল ইসলাম বিপিএম অফিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরো একধাপ এগিয়ে রাজশাহী মহানগরীর ৩২টি স্থানে ডাক বাক্সের আদলে তথ্য/অভিযোগ বক্স স্থাপন করেছেন। অফিসে না এসেও নাগরিকরা তাঁকে অনেক বিষয় জানাতে পারছেন এবং তিনি নিজে সেগুলো পড়েন এবং ব্যবস্থা নেন। যে কেউ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

অভিযোগ/পরামর্শ বক্স
পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জনাব বশির আহমদ এর কার্যালয়ে অভিযোগ/পরামর্শ বক্স স্থাপন করা হয়েছে।

ইনোভেশন বক্স
বিআরটিএ খুলনা সার্কেলে ইনোভেশন বক্স সংযোজন করার কথা শুনেছি। ইনোভেটিভ কোনো আইডিয়া যা সেবা প্রদান কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে তা ইনোভেশন বক্সে প্রদান করা যায়।

আইডিয়া বক্স
একটু ভিন্ন ‘আইডিয়া বক্স’ নামে কাজ করেছিলেন সমবায় বিভাগের সিলেট বিভাগের যুগ্ম নিবন্ধক জনাব খোরশেদ আলম। প্রথম মাসেই ১৯টি আইডিয়া জমা পড়েছিল। তিনি বদলী হয়ে ময়মনসিংহে চলে আসার পর এখন কি অবস্থা তা অবশ্য জানি না।

পরামর্শ বক্স
শহর সমাজসেবা কার্যালয়, নীলফামারীর সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ সাদিকুর রহমান মন্ডল কয়েক মাস আগে পরামর্শ বক্স স্থাপন করেছেন।  প্রতি মাসেই ২/১টি পরামর্শ জমা পড়ে একেবারেই সাদামাটাভাবে হাতে বানানো কাগজের এই বাক্সে।

প্রতিক্রিয়া বক্স
বিষয়টি বোধহয় প্রথম করে দেখান পাটগ্রামের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর আলম। অফিসে কোনো সেবা গ্রহীতা এলে তার নাম, ধাম, নম্বর, উদ্দেশ্য রেজিষ্টারে লিখে একটি টোকেন ধরিয়ে বলে দেন যাবার সময় প্রতিক্রিয়া জানাতে। সন্তুষ্ট হলে সবুজ আর অসন্তুষ্ট হলে লাল বাক্সে টোকেন ফেলতে হবে। অফিসের সামনে গ্রিলের সাথে দুটো টিনের বাক্স ঝুলিয়ে দিয়েছেন। একটি লাল, একটি সবুজ। গত এপ্রিল/২০১৬ হতে এই মূল্যায়ন কার্যক্রমটি চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রত্যেক মাসের শেষ দিন বাক্স খোলা হয় এবং হিসাব করা হয় কত ভাগ লোক আমাদের সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং কত ভাগ সন্তুষ্ট হতে পারেনি। লাল বাক্সের টোকেন গুলির সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী সেবা গ্রহনের উদ্দেশ্য ও সেবা প্রদানকারী নির্বাচন করা হয় এবং অফিসের সকল কর্মকর্তা কর্মচারীকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দুর্বল দিকগুলি নিয়ে আলোচনা করে কিভাবে ভাল করা যায় তার পদক্ষেপ নেয়া হয়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে শেষ ৩ মাসে লাল বাক্সে কোনো টোকেন পরেনি।

সন্তুষ্টি বক্স
আপনি যে সেবাটি পেলেন, তার মান কেমন? খুব ভালো, ভালো, না নিম্নমানের? কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেমন ব্যবহার করেছেন? কেউ অতিরিক্ত টাকা বা ঘুষ নিয়েছে কি না, এমন কথা লেখা স্মাইলিং কার্ড সেবাগ্রহীতার হাতে দিয়ে মন্তব্যের ঘরে টিকচিহ্ন দিতে বলা হচ্ছে। এমন জবাবদিহিমূলক সেবা দিচ্ছে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ভূমি কার্যালয় এসি ল্যান্ড শিহাব রায়হানের নেতৃত্বে।

এবার দেখা যাক, কিভাবে স্মাইলি কার্ড কাজ করে। সেবাগ্রহীতাগন যখন কোনো সেবার জন্য ভূমি অফিসে আসেন, সেবাংগনে তাঁর নাম-ঠিকানা রেজিস্টারভুক্ত করে সাথে দেয়া হয় স্মাইলি কার্ড। তাঁকে বলা হয় আপনার প্রাপ্ত সেবা শেষে সন্তুষ্টি অনুযায়ী কার্ডে স্বাক্ষর করে সেবা কেন্দ্রের বাইরে রক্ষিত সন্তুষ্টি বাক্সে কার্ডটি ফেলবেন। তাছাড়া, প্রতিটি সেবার এন্ড পয়েন্ট-এ সহকারীগনও সেবাগ্রহীতাদের স্মাইলি কার্ড প্রদান করেন। মাসের শুরুর দিনে বাক্স খুলে সেবাগ্রহীতাদের সন্তুষ্টি পরিমাপ করা হয় এবং সেবার মান বাড়াতে তাৎক্ষনিক সভা ডেকে সেবাপ্রদানকারীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়।

দেখা যাচ্ছে সেবাগ্রহীতারা সেবার মান কেন নিম্নমান সে সম্পর্কে স্মাইলি কার্ডের পেছনে উল্লেখ করছেন না। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেনের নজরে আনলে তিনি বলেন-“সেবাগ্রহীতাগণ স্মাইলি কার্ডে স্বাক্ষর না দিয়ে টিক চিহ্ন দিবে, স্বাক্ষর দিবে শুধু সেবা প্রদানকারী। তাহলেই আর ধরার ভয় থাকবে না ‘’।

প্রতি মাসে সেবাগ্রহীতাদের ফেলা স্মাইলিং কার্ড বাক্স থেকে খুলে পড়া হয়। সব কার্ড পড়ে যদি কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সব কার্ডের মূল্যায়ণ করা হয়। যে-কেউ সেবাগ্রহীতা সেজে এটা পরীক্ষা করতে পারেন।

অারও সন্তুষ্টি বক্স
এপ্রিল ২০১৭ থেকে  কোতয়ালী রাজ্স্ব সার্কেল ঢাকার রুপান্তরের উদ্বোধনকালে সন্তুষ্টি বক্সের চাবি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কাছে প্রদান করা হয়। প্রথম মাসে মোট ৯৭ টি কার্ডের মধ্যে ৮৯ টি সন্তুষ্টি, ৫ টি অসন্তুষ্টি, ২ টি গড়মান মাত্রা প্রকাশক ও ১ টি বাতিল কার্ড পাওয়া যায়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) র‍্যানডমলি কয়েকটি কার্ডে প্রদর্শিত মোবাইল নম্বরে ফোন করে মূল্যায়নকারীর যথার্থতা যাচাই করেন। যে সকল কার্ড অসন্তুষ্টি মাত্রা প্রকাশক সে সকল কার্ডে প্রদর্শিত নম্বরে ফোন করে অসন্তুষ্টির কারন জানারও চেষ্টা করা হয়।

মূল্যায়ণ বক্স
শেরপুর সদরের এসি ল্যান্ড জনাব মুকতাদিরুল আহমেদ এর মূল্যায়ণ বক্সটি অভিনব। লম্বা একটি কাঠের বাক্সে অফিসের ৫ জন কর্মচারীর জন্য ৫ টি আলাদা খোপ। খোপের উপর প্রত্যেকের নাম, ছবি লাগানো আছে। লাল, হলুদ, সবুজ তিন রঙের কার্ড আছে। যার কাছ থেকে যেমন সেবা পেলেন সে অনুযায়ী রঙের কার্ড তার ঘরে সেবাগ্রহতিারা ফেলে যাবেন। সপ্তাহ শেষে সবার কার্ড বের করে মূল্যায়ণ করা হয়। ডিসেম্বর/২০১৬ থেকে শুরু হয়েছে মূল্যায়ণ বক্সের ব্যবহার। গড়ে প্রতি সপ্তাহে ২৫/৩০ টি কার্ড জমা পড়ে।

বাক্স বিশ্লেষণ
মজার বিষয় হলো নূর আলম ও শিহাব রায়হান দুজনই এপ্রিল/২০১৬ থেকে শুরু করেছেন। যমজ সন্তানদের মধ্যে বড় ছোট চিহ্নিত করার মতো অপ্রয়োজনীয় প্রয়াসে না যাই। জনাব নূর আলমের পরিকল্পনা আছে লাল সবুজ বাক্স এমন স্থানে রাখার যেন টোকেন ফেলার সময় সেবাগ্রহীতা কোন বাক্সে টোকেন ফেলছেন সেটি দেখা না যায়। হয়তো এরমধ্যে করেই ফেলেছেন। তবে সেবাগ্রহীতাদের নাম, ধাম লিখে রাখা হয় বলে প্রকৃত প্রতিক্রিয়া উঠে আসছে কিনা সেটি সময়ই বলে দেবে। জনাব শিহাব রায়হানের একটি সুবিধা হলো তাঁর উপজেলা ভূমি অফিসে নূর আলম সাহেবের উপজেলা কৃষি অফিসের চেয়ে সেবাগ্রহীতাদের ভিড় বেশী। আর নাম, পরিচয় লিখে রাখা হয় না বলে প্রকৃত প্রতিক্রিয়া পাবার সম্ভাবনা বেশী বলে অনেকে মনে করেন। লাল সবুজ প্রতিক্রিয়া বাক্সে ‘সন্তুষ্ট’ ও ‘অসন্তুষ্ট’ দু’রকম প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সুযোগ আছে। পক্ষান্তরে সন্তুষ্টি বাক্সে ‘খুব ভাল’, ‘ভাল’ আর ‘নিম্নমান’ তিন ধরণের মতামত বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে নিঃসন্দেহে। নূর আলম সাহেবের ব্যবহৃত কার্ডে লেখা থাকে ‘সন্তুষ্ট না হবার কারণ লিখুন’ আর শিহাব রায়হানের কার্ডে সেবা কেন নিম্নমানের চিহ্নিত করার জন্য চারটি অপশন দেয়া থাকে। টিক দিলেই হয়। তবে দুজনই বলেছেন কেন অসন্তুষ্ট বা সেবা কেন নিম্নমানের তা জানাতে সেবাগ্রহীতাদের খুব একটা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তারা ‘অসন্তুষ্ট’ বা ‘নিম্নমান’ জানিয়েই খালাস। মুকতাদিরুল আহমেদের মূল্যায়ণ বক্সে কার্ড ফেলার বিষয়টি গোপন কক্ষে ব্যালট ফেলার মতো এবং তিন রঙের কার্ড দিয়ে সন্তুষ্টির মাত্রা প্রকাশের পাশাপাশি সাদা কার্ড এর মাধ্যমে অভিযোগ, মতামত বা সুপারিশ জানানোর সুযোগও আছে। তবে অফিসে কর্মচারীর সংখ্যা বেশী হলে বাক্সের এই ধরণটি হয়তো উপযুক্ত হবে না।

প্রতিটি সরকারী অফিসে এমন বাক্স স্থাপন করা যায়, যেখানে সেবা দানের ভালো-মন্দ বা সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা যাবে। সে বাক্স যদি প্রতি সপ্তাহে বা মাসে ১দিন সবার সামনে খোলা হয়, তাতে বোঝা যাবে কোন বিভাগ কেমন সেবা দিচ্ছে, সেবা গ্রহীতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে কিনা, কোনো সমস্যা বা দুর্নীতি হচ্ছে কি না। এটি চালু করা গেলে সরকারি অফিসের সেবাদান প্রক্রিয়া আরও সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই মত ব্যক্ত করেছেন।

ওস্তাদের মারঃ স্বচ্ছ বক্স
সম্প্রতি সরকারি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের সন্তুষ্টি যাচাইয়ের জন্য দুটি বাক্স স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার জনাব হেলালুদ্দীন আহমেদ। তাঁর প্রস্তাব মতে, প্রত্যেক সরকারি অফিসে ২টি স্বচ্ছ বক্স থাকবে যাতে সেবা গ্রহীতাগণ সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট কি-না সে বিষয়ে মতামত প্রদান করবেন।  একটিতে থাকবে ইতিবাচক মত, আরেকটিতে থাকবে অসন্তোষ বা সমালোচনা বা আরও ভালো সেবার জন্য পরামর্শ।

জনাব হেলাল উদ্দিন আহমদকে আজও রাজশাহী বিভাগে আধুনিক ভুমি ব্যবস্থাপনার সার্থক রূপকার বলা হয়। রাজশাহী বিভাগের এসিল্যান্ডগণ তাঁর নির্দেশনায় নানারকম উদ্ভাবন বাস্তবায়নে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলেন। বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা  হিসাবে যোগদান করেই তিনি বলেন শুধু ভূমি ব্যবস্থাপনা নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, মানব উন্নয়ন সব ক্ষেত্রেই উদ্ভাবনী সংস্কৃতির প্রচলন করবেন। বাক্সের যদি প্রাণ থাকতো তাহলে হয়তো বলতো ‘‘পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে’’। দেশের মানুষ এবার বাক্স বিষয়ে তাঁর মতো স্বচ্ছ কর্মকর্তার কাছে কিছু আশা করতেই পারে।

Categories: উদ্ভাবন