আজ- শুক্রবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  Empathy, Patriotism & Commitment Group: একটু বিশ্লেষণ       বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ইনোভেশনের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তার মধ্যে জনপ্রশাসনে উদ্ভাবন অগ্রগণ্য। ইনোভেশন বা উদ্ভাবন বিষয়টি যে শুধু দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা নয় বরং সাধারণ মানুষের জীবন যাপনকে করছে গতিশীল ও সহজসাধ্য।

কিন্তু দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য সেক্টরেও ইনোভেশন প্রয়োজন। দেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়। এদেশে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তবে প্রশাসনিক কাজের এবং একাডেমিক কার্যক্রমের ধরণ অনুযায়ী পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। সেই বিচারে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টি বাদ রেখে আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশনের প্রয়োজনীয়তার প্রতি আপাতত দৃষ্টি দিতে পারি।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের এমন ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে সারা দেশ থেকে নানা ধরণের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত শ্রেণীর, শহর কিংবা গ্রামের, সব ধর্মের- বর্ণের শিক্ষার্থী, আদিবাসী বা প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থী সবার সমঅধিকার আছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ পাবার। সেই বিচারে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব ধরণের কার্যক্রম এমন হওয়া উচিৎ যা জনজীবনে জটিলতা সৃষ্টি না করে জীবনকে করবে সহজসাধ্য। কিন্তু বাস্তবতা এই যে শিক্ষার্থীদের এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া থেকেই শুরু হয়ে যায় বিড়ম্বনা। তাই প্রথমেই যে বিষয়টির পরিবর্তন প্রয়োজন তা হলো ভর্তি প্রক্রিয়া। দেশের ৩৭ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সংখ্যক আসনে ভর্তির সুযোগ পাওয়া অনেকটাই যেন সোনার হরিণ হাতে পাবার মতো বিষয়। আর এ সোনার হরিণ ধরবার আশায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও দুশ্চিন্তা আর ভোগান্তির অন্ত থাকেনা। একথা সত্যি যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনগুলো ভর্তির মৌসুমে হাজার হাজার ছেলেমেয়ের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কিছু বাড়তি আয়-রোজগারের সুযোগ পায় তাও সত্যি। কিন্তু র্শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জীবন যে পরিমান দূর্বিসহ হয়ে ওঠে তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভতির্র প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিষয়টির প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিধায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া যদি সমন্বিতভাবে করা যায় তা নিংসন্দেহে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের জীবনে স্বস্তি বয়ে আনবে। মেডিকেল কলেজের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সমন্বিত ভর্তি প্রক্রিয়া চালু হলে সময়, যাতায়াত এবং অর্থ খরচও (TCV) তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে যাবে। কাজেই পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার মধ্যে দিয়েই ইনোভেশনের প্রয়োগ শুরু হতে পারে।

দ্বিতীয়ত: যে বিষয়টির প্রতি মনোনিবেশ করা প্রয়োজন তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শিফট চালু করা। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়েগুলোর বিদ্যমান সুযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে একই ব্যবস্থাপনায় একই অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্বিগুণ সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্যে উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রক্রিয়া সরকার এবং সাধারণ মানুষের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি অন্যান্য জটিলতা ও ঝামেলা কমাবে।

তৃতীয়ত: আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় আনা যেতে পারে তা হলো বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত পরিবহণ ব্যবস্থা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার জন্য বাসের ব্যবস্থা আছে। এটি নি:সন্দেহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জন্যে খুব কার্যকর একটি পদক্ষেপ। তবে একথাও সত্যি যে এই সুবিধা প্রদান করতে যেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়। অনেকগুলো বাস, বাসের জ্বালানী, রক্ষাণাবেক্ষণ ইত্যাদি বাবদ প্রতি বছর কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ হয়। আর সেই সাথে অব্যস্থাপনা ও দক্ষ জনবলের অভাবের বিষয়গুলোও অবহেলা করা যায় না। এক্ষেত্রেও ইনোভেশন সম্ভব। পরিবহণ ব্যবস্থাকে আউটসোর্সিং করে এই শ্বেতহস্তী পোষার খরচ এবং এই সংক্রান্ত অন্যান্য ঝামেলা সহজেই কমিয়ে ফেলা সম্ভব। আউটসোর্সিং করতেই হবে তা নয়, লিজ নিয়ে অচিরেই এর সুফল ভোগ করা যেতে পারে। এভাবে ভাল সার্ভিস এবং পরিবহণ দপ্তরের পিছনে ব্যয়কৃত বিপুল পরিমান অর্থের সাশ্রয় সম্ভব।

চতুর্থত: বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এনেও ভোগান্তি এবং অর্থব্যয় কমানো সম্ভব। উদাহারণস্বরূপ বলা যায়, ভর্তি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ এখন যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে না এসে এলাকায় বসেই শিক্ষার্থীরা অনলাইনে করতে পারে তেমনি বিভিন্ন সেমিষ্টার বা শিক্ষাবর্ষে পরীক্ষা দেবার ফরম ফিলাপও অনলাইনে করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের সময়, যাতায়াত এবং অর্থ তিনটিই কম খরচ হবে। এই প্রক্রিয়া চালু করলে পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের ঝামেলা অনেকাংশে কমে যাবে।

প্রসঙ্গক্রমে আরও বলা যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হলগুলোতে সাধারণত মেধা তালিকার ক্রম অনুসারে রুমে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই মেধা তালিকাটি যদি অনলাইনে প্রকাশ করা হয় তাহলে সহজেই সবাই জানতে পারবে। ফলে বার বার হলে এসে নোটিশ বোর্ড দেখা বা হাউজ টিউটর বা প্রভোষ্টের পেছনে ঘোরাঘুরির প্রয়োজন পড়বে না। পাশাপাশি হলের বিভিন্ন নোটিশও অনলাইনে প্রকাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হল সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সহজে জানানো সম্ভব। হল বিষয়ক আলোচনা থেকে আরও যে বিষয়টি মনে পড়লো তা হলো হলের ডাইনিং ব্যবস্থা। সব হলেই একসময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তুকি দিয়ে ডাইনিং চালাতো। নানা ধরণের জটিলতা দেখা দেয়ায় বেশ কিছু হলের ডাইনিং লিজ দিয়ে দেওয়া হয়। এতে নানাবিধ জটিলতার নিরসন হয়। এই পদ্ধতি যদি সব হলেই চালু করা যায় বা ব্যক্তিকে দায়িত্ব না দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় তবে খাবারের মান বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য ঝামেলাও দূর হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে ভর্তুকিও আর দিতে হবে না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশন এর প্রয়োজনীয়তা ও প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বেতন নিয়ে কিছু না বলা হয়। একথা সত্যি যে সবার জন্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে সরকার বদ্ধপরিকর। আবার এটাও সত্যি যে উচ্চশিক্ষা একটি ব্যয়বহুল বিষয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারে। কারণ সেসব দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় অনেক বেশী। কিন্তু আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা নামমাত্র বেতন দিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে সমর্থ হয়। এই নামমাত্র বেতন যোগাতেও অনেকে হিমশিম খান। পাশাপাশি এটাও সত্যি যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে সরকারী অনুদানে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদান সম্ভব নয়। তাই শিক্ষার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

শুধুই নমুনা হিসাবে কয়েকটি আইডিয়া এখানে উল্লেখ করলাম। এরকম নানা ধরণের উদ্ভাবনের সুযোগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছে এটি তুলে ধরাই উদ্দেশ্য ছিল। আশা করি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রোগ্রামের ক্যাপাসিটি ডেভেলেপমন্টে টিম বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

লেখকঃ ড. মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব, প্রফেসর, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Categories: আপনাদের লেখা