আজ- সোমবার, ২৫শে অক্টোবর, ২০২১ ইং, ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  Empathy, Patriotism & Commitment Group: একটু বিশ্লেষণ       বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

ফেসবুক দিয়ে খাল উদ্ধারঃ কীর্তনখোলার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে

মৃতপ্রায় জেল খালকে মানুষের অবহেলা, আবর্জনার অত্যাচার আর দখলের দাপট থেকে মুক্ত করার পথনাটক দেখলাম ৩ সেপ্টেম্বর বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ থেকে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ মঞ্চে। এর চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে গত সাড়ে চার মাস ধরে ডিসি ড. গাজী সাইফ এর বরিশাল জেলা প্রশাসনের ‘বরিশাল-সমস্যা ও সম্ভাবনা’ ফেসবুক গ্রুপে। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে বরিশাল জেলা প্রশাসন ও সিটিজেন জার্নালিস্টরা। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছে ‘পরিবর্তন চাই’ সহ অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিভিন্ন এনজিও, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সরকারী দপ্তর, সিটি কর্পোরেশন, কাউন্সিলরগণ, কয়েকজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, রোভার স্কাউট, ব্যান্ড দল এবং সচেতন নগরবাসী। এমন সরকারি-স্বায়ত্বশাসিত-বেসরকারি-ব্যক্তিগত মেলবন্ধন বিরল যা জনবান্ধব প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

‘বরিশাল-সমস্যা ও সম্ভাবনা’ ফেসবুক গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪৩ হাজার। এদের মধ্যে অন্ততঃ ১০ হাজার সদস্য কমেন্ট, লাইক, পোস্ট, উপস্থিতি, সহযোগিতা দিয়ে সিটিজেন জার্নালিস্টের ভূমিকা রেখে চলেছে। এদের মধ্যেই একজন জেল খালের সমস্যাটি গ্রুপে তুলে ধরে জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সিটিজেন জার্নালিস্টরা অভিযানের পক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহ, জনমত গঠন ও অভিযানে অংশগ্রহণ এবং Barisal fb TV তে অভিযান সরাসরি সম্প্রচার করেও সবিশেষ ভূমিকা রেখেছে। জেলা প্রশাসন যখন অবৈধ দখল চিহ্নিত করছে ভিন্ন ঘরানার এই জার্নালিস্টরা তখন হাজার হাজার গণ স্বাক্ষর সংগ্রহ করে চলেছে। বিষয়টি এতোই আলোচিত হতে থাকে যে পত্রিকা ও টিভি নিউজেও স্থান করে নেয়। এরা স্থানীয় তরুণ – যারা স্বেচ্ছাব্রতী মানসিকতা নিয়ে সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে এগিয়ে আসে। এরা নাগরিক সমস্যা উপস্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বরিশাল জেলা প্রশাসন তাদের উৎসাহিত করেছে ও করছে। ডিসি, এনডিসির পাশাপাশি এদের কয়েকজন গ্রুপের এ্যাডমিন হিসাবেও প্রতিনিয়ত ভূমিকা রেখে চলেছেন। বেসরকারিভাবে ফেসবুকের শক্তির খবর জানি। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে ফেসবুকের এই শক্তি অজানা ছিল।

14247871_1727405970809392_1197253370_o 14225432_10210493521355874_7345178240593287926_n 20160903_112302 14192145_1111497855603439_3518556200719186568_n

এই গ্রুপে বরিশালের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরা যায়। জেলা প্রশাসন অবহিত হয়ে অনেক ছোট ছোট সমস্যার সমাধান করছে বেশ কিছুদিন ধরে। কিন্তু তাই বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও করতে না পারা অনেক পুরনো জেল খালের অপদখল উচ্ছেদ ও আবর্জনা অপসারণ তো কেবল ছোটো খাটো সামাজিক সমস্যার সমাধান নয়, রীতিমতো সামাজিক আন্দোলন। সরকারী উদ্যোগে ফেসবুক নির্ভর সিটিজেন জার্নালিজমের এতো বড় সফলতা শুনিনি। সরকারী উদ্যোগে সামাজিক সমস্যা সমাধানে হাজার হাজার (প্রায় কুড়ি হাজার) জনগণকে সম্পৃক্ত করার এমন উদ্ভাবনী দৃষ্টান্তও দেখিনি।

৩ কি.মি. জেল খালকে ৩০টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। ১০০ মিটারের প্রতিটি সেক্টরে ছিলেন একজন করে এডিসি, ম্যাজিস্ট্রেট, কাউন্সিলর, মুক্তিযোদ্ধা, একটি করে সরকারী দপ্তর, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১০ জন পেশাদার পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং আরও অনেকে। প্রতি সেক্টরে ১০০০ করে মানুষ থাকলে ৩০ সেক্টরে ৩০,০০০ মানুষের সে এক মহা সম্মিলন। শ্রেষ্ঠ তিনটি সেক্টরের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকায় বেশ একটা প্রতিযোগিতার আবহও তৈরী হয়েছিল।

জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারার শক্তি যে কতো সর্বব্যাপী তা বোঝা গেল অভিযানের আগেই অধিকাংশ অপদখলকারীর নিজ উদ্যোগে স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলার ঘটনায়। শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়েও কাজটি করা যেত। কিন্তু উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা এক দিনের বিষয় নয়। এটি নিয়মিত করতে হয়। সেজন্যই জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই। জেলা প্রশাসন সে কাজটিই করেছে। খালের পাশ দিয়ে হাজারো মানুষের ভিড়, ব্যান্ড দলের তৎপরতা, খাল উদ্ধার নিয়ে রচিত বাউল গানের আসর, কয়েক ডজন নৌকায় করে খাল পরিষ্কারের অভিযান, খালের ধারে কেক কেটে জন্মদিন পালন, – সব মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষের দারুন এক উৎসব। অবাক হবো না আগামীতে বরিশালে যদি ৩ সেপ্টেম্বর ‘জেল খাল দিবস’ হিসাবে পালিত হয়।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নগর উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালের জেল খালের পাশ দিয়ে হাঁটার পথ এবং নৌ-পথে স্পিডবোট ও নৌকায় ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হবে মর্মে ২৫ কোটি টাকার প্রজেক্ট বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেন স্থানীয় সরকার সচিব। সচিব ছাড়াও অভিযানের বিভিন্ন সময়ে এসে যোগ দিলেন মেয়র, এমপি এমনকি প্রতিমন্ত্রীও। সাধারণতঃ তাঁদের ঘিরেই জনতার জমায়েত দেখা যায়। কিন্তু জনতা তো এখানে খাল পরিষ্কারে ব্যস্ত। তাই তাঁদেরকেই জনতার কাতারে নেমে এসে সংহতি প্রকাশ করতে দেখা গেল।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো সরকারী একটি দপ্তরের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে স্বায়ত্বশাসিত সিটি কর্পোরেশন যোগ দিয়েছে। ‘পরিবর্তন চাই’ সংগঠনটি সারা দেশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়েই কাজ করে বিধায় এই অভিযানের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করে সহ আয়োজকের ভূমিকা নিয়েছে। অন্যান্য সংগঠনগুলো সরাসরি পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কাজ না করলেও একটি মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে পাশে থেকেছে। সিটিজেন জার্নালিস্টদের অনেকে যেসব এনজিও ও সংগঠনের সাথে যুক্ত সেসব এই আয়োজনের সাথে থাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক। অন্যরাও দূরে থাকতে পারেনি। সব মিলিয়ে ৬৮টি এনজিও, ২৮টি সাংস্কৃতিক এবং ১৭টি সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই অভিযানের প্রয়োজনীয়তা ও জনপ্রিয়তার জোয়ারে যোগ দেয়। অন্যতম সিটিজেন জার্নালিস্ট দীপু হাফিজুর রহমানের প্রস্তাবটি ভাল – সব জেলা প্রশাসনের ‘বরিশালঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা’ ধরণের ফেসবুক গ্রুপ থাকা দরকার। ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় করাও হয়েছে। বিভিন্ন রকম নাম না দিয়ে একরকম নাম রাখলে গ্রুপগুলো মানুষের খুঁজে পেতে সুবিধা হবে।

এখানে নেতৃত্ব দিয়েছে সরকারী দপ্তর, সংগঠিত হয়েছে ফেসবুকে, বিকশিত হচ্ছে সিটিজেন জার্নালিজম, সম্পৃক্ত হচ্ছে জনগণ, সমাধান হচ্ছে সামাজিক সমস্যার, সূচিত হচ্ছে সামাজিক আন্দোলন। কোনোটিই সহজ নয়। জেল খাল সামনের দিনগুলোতে অনেক আঞ্চলিক ও সামাজিক সমস্যাকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করবে। পথ দেখাবে। সাহসও যোগাবে। সবচেয়ে বড় কথা পুরো কাজটি শাসনের লাঠি দিয়ে নয় সচেতনতার বাঁশি বাজিয়ে করা হয়েছে। বরিশালের বাঁশির সুর ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে।

পুনশ্চঃ শুনলাম জেল খাল দিয়ে নৌকা বয়ে এখন কীর্তনখোলা নদীতে গিয়ে ঢেউ তুলছে। পরের দিন দেখলাম প্রধানমন্ত্রী ‘আলাপন’ এ্যাপ উদ্বোধন করলেন বরিশালের এই বাঁশিওয়ালার সাথে কথা বলে। আজ জানলাম আগামী ১০ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন লৌহজং নদীর অপদখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করছেন। বুঝলাম কীর্তখোলার ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

Categories: ইভেন্ট