আজ- শনিবার, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  Empathy, Patriotism & Commitment Group: একটু বিশ্লেষণ       বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

উদ্ভাবনের গল্পের বয়ান ও বুনন

ভালো লেখার তিনটি গোপন রহস্য আছে, তুমি তা জানো?’ এক অধ্যাপক জিজ্ঞেস করলেন তাঁর ছাত্রকে। ছাত্র তো নির্বাক। ভাবছে স্যার মনের কথা বলার জন্যই ভূমিকা করছেন। অপেক্ষার দৃষ্টি নিয়ে তাঁকিয়ে থেকে থেকে ছাত্র একসময় জিজ্ঞেসই করে বসলো, স্যার আপনি কি তা জানেন? অন্য দিকে উদাসীন দৃষ্টি দিয়ে স্যার বললেন, নাহ, আমিও জানি না। কৌতুকটি সমারসেট মমের মজার কথাটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন, উপন্যাস লেখার তিনটি কৌশল আছে। দুর্ভাগ্যবশত কেউই তা জানে না! এই হলো ভালো লেখার রহস্য; যা কেউ জানে না। তবে আর কৌশল নিয়ে কেন এতো ভাবনা?

লেখা নিয়ে খ্যাতিমান লেখকদের বিচিত্র মনোভাব আমাদের আকৃষ্ট করে। চিন্তিতও করে। ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি-খ্যাত ঔপন্যাসিক হেমিংওয়ের মতে, লেখক হবার জন্য লেখার কোন প্রয়োজন নেই। টাইপরাইটারের সামনে গিয়ে রক্তক্ষরণ করলেই তা হয়ে যাবে লেখা। তো আমরা কী-বোর্ডের সামনে রক্তক্ষরণ করি চলুন।

উদ্ভাবনের বা রুপান্তরের গল্প লেখার নিশ্চয়ই অনেক উপায় আছে। তারপরও হয়তো বুঝে উঠতে পারছেন না কোথা থেকে শুরু করবেন। ‘বুঝতে পারছিনা এই উদ্ভাবনটির কথা কোথা থেকে শুরু করবো’ এটা লিখেই শুরু করুন। মাঝামাঝি গিয়ে বলুন মনে হয় এখান থেকে শুরু করলে ভাল হতো। এখানে কিছু কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, মিলিয়ে দেখতে পারেন! হয়তো কাজেও লাগতে পারে।

শিরোনামে আকর্ষণ তৈরী করুন

গল্পের আকর্ষণীয় শিরোনাম একটি সম্পদ। শিরোনাম হবে ছোট, আকর্ষণীয় ও বিষয়সংশ্লিষ্ট। শিরোনাম দেয়ার ক্ষেত্রে লেখকের দক্ষতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমন শিরোনাম দেয়া উচিৎ যা শুধু আকর্ষণীয়ই হবে না, উপযুক্ত শব্দচয়ন ও বিন্যাসনির্ভর যা পাঠকের মনে কৌতূহল জাগাবে। শিরোনাম কখনোই দীর্ঘ ও অপ্রাসঙ্গিক হবে না। বলা হয়ে থাকে একটি ভালো শিরোনাম গল্পকে মূল্যবান করে তোলে।

 

গল্পের নাম যেন মানুষকে টানে সেদিকে খেয়াল করা দরকার। আপনি হয়তো নাম দিলেন ‘একটি স্বপ্নের গল্প’। কি স্বপ্ন, কার স্বপ্ন, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু আপনার গল্পের নাম যদি হয় ‘চৌচিং মাতব্বরের স্বপ্ন’ তাহলে খেয়াল করুন কেমন যেন একটি আকাঙ্খা তৈরী হচ্ছে জানার। নাম ‘কৃষকের স্বপ্ন’ না হয়ে ‘সাধারণ কৃষকের স্বপ্ন’ হলে বাড়তি আকর্ষণ তৈরী হয়। একটি গল্পের নাম ‘লাল বাক্স সবুজ বাক্স’ না হয়ে ‘লাল সবুজের গল্প’ হলে অনেক বেশী কৌতূহল তৈরী হয়। একটি গল্পের নাম হতে পারতো ‘গুগল ম্যাপসে অফিস যোগ করা’। যেন সব কথাই বলা হয়ে গেল, কোনো রহস্য আর অবশিষ্ট থাকলো না। কিন্তু নামটি যদি হয় ‘গুগল ম্যাপসের সাথে প্রেম’ তাহলে কৌতূহল তৈরী হচ্ছে কিনা খেয়াল করুন।

ধারণা ভাঙ্গার গল্প

প্রথম লাইনে আপনার একটি ধারণার কথা লিখুন। সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা হলে ভাল হয়। যে ধারণার সাথে পাঠক নিজেকে মেলাতে পারে সহজে। পাঠকেরও যেহেতু ঐরকম ধারণা সেহেতু সে নিজেকে খুঁজে পাবে সেখানে। আগ্রহী হবে। শুরুতেই ধারণাটির কথা বলার কারণে পাঠক এটিও বুঝবে যে, এই ধারণা বোধহয় ভুল প্রমাণিত হবে। কিভাবে প্রচলিত একটি ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো এটি জানার জন্য পাঠক উৎসাহী হতে পারে। গল্পের মধ্যে সেই ধারণাটিকে ধাক্কা দিন। প্রয়োজনে পুরোপুরি ভেঙ্গে ফেলুন।

মন গোছানো

লেখার আগে গল্পের বিষয়গুলো মনের মধ্যে গুছিয়ে নিতে হবে। আরম্ভ করবেন কিভাবে এবং পর্যায়ক্রমে গল্পটি শেষ করবেন কিভাবে তার ধাপগুলো মনের ভেতর গুছিয়ে নিন। এটাকেই বলা হয় মন গোছানো। প্রয়োজনে পয়েন্ট আকারে নোট রাখতে পারেন।

উত্তেজনাপূর্ণ অংশ দিয়ে লেখা শুরু করুন

সবচেয়ে চমকপ্রদ বা উত্তেজনাপূর্ণ অংশ দিয়ে লেখা শুরু করুন। এরপর গল্পকে বিস্তৃত করুন। শুরু করতে হবে আকস্মিক একটি কথা বা ঘটনার সূত্রপাত দিয়ে যা পড়ে প্রথমে পাঠক চমৎকৃত হবেন ও গল্পের ভেতরে অজানা কী আছে তা জানার জন্য আগ্রহী হবেন। তাঁর ভেতরে গল্পের সম্পূর্ণ কাহিনী জানার জন্য একধরনের তাগিদ তৈরি হবে। সব চেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা হচ্ছে লিখতে শরু করা। প্রথম পৃষ্ঠা, বিশেষ করে প্রথম বাক্যটি লেখা সব চেয়ে কঠিন বলে মনে করেন লেখকরা। অনেক সময় প্রথম বাক্যটির জন্যই পাঠক গল্পের বাকী অংশটি পড়েন। সূচনাটা হতে হবে সংক্ষিপ্ত। কারণ গল্পের পরিসর কম। অনেক সময় শুরুটা হতে পারে নাটকীয়। রবীন্দ্রনাথের ’হৈমন্তী’ গল্পের প্রথম বাক্যটি স্মরণ করুন- ‘কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না।’ হৈমন্তী গল্পের যে কালপর্ব তখনকার হিসাবে কন্যার বয়স অনেক বেশি ছিলো। সে বিবেচনায় কন্যার বাপেরই তাড়া থাকার কথা। পুরো বিষয়টা উল্টো, তাই নাটকীয়। পরের বাক্যগুলোতে রবীন্দ্রনাথ তাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে রহস্যমোচন করেছেন। ও হেনরীর বিখ্যাত গল্প ”গিফট অব দা মেজাই”-এর প্রথম বাক্য-’এক ডলার সাতাশি সেন্ট।’ অতি সাধারণ ও অসম্পূর্ণ প্রকৃতির এ বাক্যটিই পাঠককে গল্পের ভেতরে টেনে নিয়ে যায়। পাঠক গল্পে আবিষ্কার করেন ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর অসাধারণ এক প্রেমকাহিনী।

গল্পের কথক

শুরুতেই স্থির করতে হবে প্রথম পুরুষে লিখবেন, না তৃতীয় পুরুষে লিখবেন? যে ধারাতেই লেখা স্থির করবেন, পুরো গল্পে সেই ধারা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। উদ্ভাবনের গল্প প্রথম পুরুষে লেখাই সহজ কারণ উদ্ভাবক নিজেই যেহেতু লিখছেন। এতে খুব দ্রুত নিজেকে গল্পের সাথে যুক্ত করে ফেলা যায়। কিন্তু তৃতীয় পুরুষ আপনার ভাবনার জগতটাকে অসীম করে তুলতে পারে। অনেকের মতে, তৃতীয় পুরুষে লেখা সহজতর। শুরুতে প্রথম পুরুষে (মহিলা উদ্ভাবকদের কাছে বাংলা ব্যাকরণের ‘মানুষ মানেই পুরুষ’ জাতীয় ভাবনার ত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি) কয়েকটি অনুচ্ছেদ লেখার চেষ্টা করুন। এবার ওই কয়েকটি অনুচ্ছেদকে তৃতীয় পুরুষে লেখার চেষ্টা করুন। এভাবে লিখলে দেখবেন আপনার উদ্ভাবনটি পথ খুঁজে পেয়েছে, আর আপনি পেয়েছেন গল্প লেখার গতি!

প্রথম পুরুষে লেখা গল্পে গল্পের চরিত্রের পক্ষে যতোটা জানা সম্ভব ততোটাই লেখা উচিৎ। এতে বর্ণনায় সীমাবদ্ধতা এসে যায়। তৃতীয় পুরুষে গল্প বর্ণনার লেখক বাড়তি স্বাধীনতা পান। কারণ অজ্ঞাত কথকের পক্ষে বেশি খবর জানা অস্বাভাবিক নয়। আরেকটি কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। গল্পের বয়ান প্রথম পুরুষে আরম্ভ করে তৃতীয পুরুষে পরের অংশ বিশেষ বর্ণনা করা। এভাবে বয়ানভঙ্গি ও কথক পরিবর্তনের মিশ্রণ ব্যবহার করা যেতে পারে। জাপানী লেখক আকুতাগাওয়া রায়ুনোসুকে তাঁর বিখ্যাত ‘রশোমন’-গল্পে কৌশলটি সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন (এ গল্প নিয়ে আকিরা কুরোশাওয়া ‘রশোমন’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন)।

বিনয়ের সাথে তথ্য যোগ করুন

আপনার গল্পে কোনো নতুন তথ্য সংযোজনের সময় কৌশলের আশ্রয় নিন। সরাসরি কোনো তথ্য বা উপদেশ পাঠক সহজভাবে গ্রহণ নাও করতে পারে। পাঠক আপনার দেয়া তথ্যকে আঁতলামো না ভেবে বসে। লেখক হিসেবে এই পরিমিতি জ্ঞান আপনার অবশ্যই থাকতে হবে।

গল্পের কাল

শুরুতেই স্থির করতে হবে কোন কালে (সাধারণ অতীত, নিত্যবৃত্ত অতীত নাকি পুরাঘটিত অতীত) লিখবেন। যে কালে লিখবেন সেটা গল্পজুড়ে একই রাখতে হবে। লেখার সাথে দুটি কাল বা সময়কাঠামো জড়িত। একটি আপনি যে ঘটনা নিয়ে গল্প লিখছেন সে ঘটনা ঘটার কাল। আরেকটি আপনি যখন লিখছেন তার কালপর্ব। দুটি কিন্তু ভিন্ন। তাই সাধারণত গল্পে ব্যবহৃত হয় ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কালরূপ। যেমন- ‘তিথি ঘরে ঢুকলো। ঢুকেই দেখলো সাকীব শাহাবের হাত থেকে বইটি কেড়ে নিলো।’ এর কারণ লেখক অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা বর্ণনা করেন। ইংরেজী সাহিত্যে এ কালরূপটিই ব্যবহৃত হচ্ছে প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত। বাংলা কথাসহিত্যে আর রূপকথার গল্পে ক্রিয়ার এ কালরূপটি প্রধাণত ব্যবহৃত হয়েছে। তবে বাংলা কথাসাহিত্যে সাধারণ অতীত কাল ছাড়াও নিত্যবৃত্ত বর্তমান (সে ঘরে এসে দাঁড়ায়। মিতা তার পাশে এসে বসে।), পুরাঘটিত বর্তমান ( সে বলেছে, সে করেছে।) ও পুরাঘটিত অতীত (সে বলেছিলো, সে করেছিলো।) কালরূপ একক বা মিশ্রিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটা বাংলা ভাষার অনন্যসাধারণ শক্তি আর বাংলা কথাসাহিত্যিকদের অসাধারণ প্রতিভার পরিচায়ক। কিন্তু লেখকদের জন্য এটা বিপদেরও কারণ। ঠিক জায়গায় ঠিক কালরূপ ব্যবহার এবং বিভিন্ন কালরূপের যৌক্তিক ও শিল্পসম্মত ব্যবহার করার বিষয়ে লেখকের সচেতনতা দরকার হয়। এর কোন ম্যানুয়াল নেই, ব্যাকরণ নেই, স্বয়ং লেখকই সেখানে পানিণি আর লিওনার্দো দা ভিঞ্চি।

পরিণতির পূর্বাভাস

পাঠককে এমন অনিশ্চিত, জটিল বা রহস্যে আচ্ছন্ন কাহিনীতে নিয়ে যাওয়া যাবে না, যা তাঁকে বিরক্ত করে। গল্প হতে হবে তাঁর চেনাজানা মানুষজন ও পরিবেশ থেকে। বস্তুত লেখক গল্পের কাহিনীতে অতিরিক্ত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথার বর্ণনা দেবেন না। গল্পের কাহিনীতে পাঠককে ধীরে ধীরে নিয়ে যেতে যেতে লেখক গল্পের একটি পরিণতির আভাস দেবেন। এটি ভালো গল্পের জন্য জরুরি এবং তা পাঠকের মনের আকাঙ্ক্ষাকে পরিপূর্ণ করে তোলে। লেখক গল্পের মাঝে মাঝে এমন কিছু ক্লু ছড়িয়ে দেবেন যা থেকে পাঠকের এই উপলব্ধি হয় যে, এটি তাঁর পরিচিত ভুবনের গল্প। তিনি অনুমান করতে পারেন যে, কাহিনীর পরবর্তী ধাপগুলো কী হতে যাচ্ছে।

উদ্ভাবনকে স্পষ্ট করুন

আপনার গল্পে সমস্যা ও সমাধানের পাশাপাশি আপনার উদ্ভাবনটি স্পষ্ট করুন। পিন পয়েন্ট করুন উদ্ভাবন অংশটিকে। পূর্বের ও পরের টাইম, কস্ট, ভিজিট, কোয়ালিটি (যেটি বা যেগুলো প্রযোজ্য) উল্লেখ করুন। কোন সমস্যা দূর করার জন্য এবং সেবাগ্রহীতাদের কোন ভোগান্তি লাঘব করার জন্য এই উদ্ভাবন সেটি এমনভাবে লিখুন যেন এমপ্যাথি বোঝা যায়। এ পর্য্ন্ত কতোজন সেবাগ্রহীতা উপকৃত হয়েছেন বা উদ্ভাবনটি ব্যবহার করেছেন, বলুন।

সমাপ্তি বিবেচনায় রাখুন

লেখক যে আকস্মিক ও আকর্ষণীয় বাক্য দিয়ে গল্পের সূত্রপাত করেছেন তার সমাপ্তিও টেনে দেবেন এক আকস্মিক সমাপ্তি দিয়ে। অধিকাংশ পাঠক এমন একটি সমাপ্তির প্রত্যাশা করেন। আপনি পাঠককে কি অনুভূতি দিয়ে শেষ করতে চান আশাবাদী অনুভূতি, নাকি নিরাশাবাদী অনুভূতি? তা নির্ধারণ করুন। উদ্ভাবনের গল্প আশাবাদী অনুভূতি দিয়েই শেষ করা উচিৎ। বনফুলের ‘নিমগাছ’ গল্পটির সমাপ্তির কথাই ধরুন। সারা গল্পে আছে বাড়ীর ময়লা ফেলার জায়গায় বড়ো হয়ে ওঠা এক নিমগাছের বেদনার কাহিনী। শুধু শেষ বাক্যটিতে বনফুল লিখেছেন, ‘ওদের বাড়ীর গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এই দশা।’ এক বাক্যেই পুরো গল্পের অর্থ বদলে গেলো! গল্পের শুরুর মতো শেষটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোট পরিসরে শেষ করতে হয় বলে শেষটাও রাখতে হয় সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ইঙ্গিতময়। কারণ শেষ হয়েও শেষ না হবার একটা তৃপ্তিময় অতৃপ্তির আভাস থাকতে হয়। কখনো নাটকীয়তায় শেষ হতে পারে। কখনো কখনো আকস্মিকতায় শেষ হতে পারে।

কি বাদ পড়লো ভাবুন

এখন পর্যন্ত যা লিখেছেন তা শুরু থেকে আবার পড়ুন। দেখুন, খেয়াল করুন, কি বাদ পড়েছে। উদ্ভাবনের কোনো দিক কি যোগ করতে ভুলে গেছেন? নাকি কোন স্থানের বর্ণনা, নাকি চাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্বটাই এখনো গল্পে যোগ করা হয়নি আপনার! ভাবুন, আপনার উদ্ভাবনের পিছনের সমস্যার জন্য কি কি সমাধান স্থির করেছেন আপনি? তার সবই লিখে ফেলুন। দেখুন কি বাদ পড়েছে। যোগ করুন।

দ্রুত শেষ করে ফেলুন

সব চেয়ে ভালো হয় এক বসায় গল্পটি লিখে শেষ করে ফেললে। কারণ দ্রুত শেষ করতে পারলে অখন্ড মনোযোগের মাধ্যমে ভালো একটি সৃজনকর্ম সম্পন্ন করা সহজতর হয়। সেটা সম্ভব না হলে প্রতিদিন অন্তত কিছুটা করে লিখে দুই/তিন দিনে শেষ করতে পারলে ভালো হয়। তাহলে গল্পের পুরো গাঁথুনীতে চিন্তার ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব হয়। তবে সময় নিয়ে লিখলেও সমস্যা হয় না কারো কারো। বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ গল্পকারদের একজন নোবেল জয়ী ছোটগল্পকার এলিস মুনরো প্রচুর সময় নিয়ে লেখেন। তবে তিনি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে লিখতে বসেন। আরেকটা ছোট বিষয় মনে রাখলে ভালো হয়, গল্প যে সব সময় আপনার পরিকল্পনা মতো এগুবেই তার কোন ঠিক নেই। অনেক সময় দেখবেন লিখতে লিখতে গল্পের গতিপথ আপনার ভাবনার বেড়ি ছিঁড়ে নিজের মতো পথ করে নিচ্ছে। তাতে ঘাবড়াবার কিছু নেই। দেখবেন গল্প আপনাকে আপনার ভাবনার বাইরের এক গল্পের দিকে নিয়ে গেছে। তাতে গল্পটা আরো আকর্ষণীয় হয়েও যেতে পারে।

সম্পাদনা ও পুন:লিখন

গল্প লেখা শেষ হবার পর আপনাকে বসতে হবে সম্পাদনার ধারালো কাঁচি নিয়ে। প্রথমে শুরু করতে হবে বানান, বিভক্তির ব্যবহার, ক্রিয়াপদের ব্যবহার এসব ঠিকঠাক করার জন্য। বানান সমতার একটা বিষয়ও আছে। রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপির ভেতরের সম্পাদনার বহু চি‎‎হ্ন মিলে ছবির আকৃতি ধারণ করেছে। পাশ্চাত্যের পেশাদার লেখকরা একই লেখা কমপক্ষে তিন বার লেখেন। প্রথম খসড়াকে তাঁরা অখাদ্য বিবেচনা করেন। এটা কাউকে দেখতে পর্যন্ত দেন না। প্রথম খসড়া বড়ো জোর গল্পটা সম্পর্কে ধারণা সৃষ্টির কাজেই ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় খসড়াও তাঁরা ত্রুটি সংশোধনের জন্য সম্পাদনা করেন না। এটা ব্যবহার করা হয় কাঠামো বদল (যদি দরকার মনে করেন লেখক) বা মূল বক্তব্যের সঠিক উপস্থাপন কৌশল ঠিক করার জন্য। তৃতীয় খসড়ায় গিয়ে চূড়ান্ত ঘষামাজা করে সম্পাদকের টেবিলে পাঠান (কেউ কেউ পাঁচ/সাতবারও লেখেন)।

অন্য কাউকে আপনার গল্প পড়তে দেয়ার আগে নিজে বারবার পড়ুন। প্রয়োজনীয় সংযোজন ও বিয়োজন করুন। পেশাদার কাউকে দিয়েও কাজটি করিয়ে নিতে পারেন। পাঠকদের হাতে গল্প তুলে দেয়ার আগে ছোট ছোট গ্রুপে আপনি আপনার গল্পটি ছেড়ে দিন। তাদের মতামত নিন। হতে পারে আপনার বন্ধু, পরিবারের সদস্য কিংবা অন্য কেউ, যাঁরা তাদের সৃজনশীল মতামত দিয়ে আপনার গল্পকে আরো ঋদ্ধ করতে সহায়তা করবে।

গল্পের আকার

উদ্ভাবনের গল্পের আকার ৫০০ থেকে ৭০০ শব্দের মধ্যে রাখুন। ৫০০ শব্দের মধ্যে রাখতে পারলে বেশী ভাল।

কিছু টিপস

ক) শুরু করার আগে যা ভেবেছিলেন, আর এখন যা লিখেছেন তার মধ্যে কি পার্থক্য আছে? কেউ যদি, বা কোন পাঠক যদি আপনাকে কোনো প্রশ্ন করে, তাহলে তার উত্তর মুখে মুখে না দিয়ে লেখার মধ্যে জবাব দিন।

খ) ‌সময় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদক। যখন ভালো সমাধান খুঁজে পাচ্ছেন না তখন ওই অবস্থাতেই ফেলে রাখুন। যখন এর সঠিক এবং আপনার মনমতো সমাধান পাবেন ঠিক তখনি সেটি লিখে ফেলুন। যাকনা কিছুটা সময়।

গ) লেখার মধ্যে উপমা ব্যবহার করুন। এমন উপমা দিয়ে লেখা সাজান যেন লেখার মধ্যে বিনোদন তৈরি হয়। আপনি হয়তো লিখছেন –‘আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম’। আরেকজন লিখছে– ‘মনে হলো এরচেয়ে মাটি কাটা সহজ’ । মাটি কাটা সহজ নাকি খড়ি ফাড়া সহজ লিখবেন সেটি আপনার গল্পের বর্ণনার সাথে মানানসই বিবেচনায় লিখতে হবে।

ঘ) পাঠকের মন ছোট ছোট গল্প দিয়ে নিয়োজিত রাখুন। একজন সুশী শেফ যেভাবে মাছের কাঁটা বাছতে শেখে সেভাবে লেখা শিখতে হয়। যত অনুশীলন করবেন তত দক্ষতা বাড়বে। তাই বেশী বেশী লেখার অভ্যাস রপ্ত করুন।

ঙ) সমস্যা উত্তোরণে আপনার স্বপ্নটি সেবাগ্রহীতার স্বপ্ন হিসাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করুন। যেন আপনি তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন। তাহলে এমপ্যাথি ফুটে উঠবে সহজেই। সমাধানের শেষে ভবিষ্যত পরিকল্পনা বা উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত ছোঁয়া দিন। এটি পরিশিষ্ট আকারেও দিতে পারেন। আসলে Innovation is not a destination, innovation is a journey. কাজেই উদ্ভাবনের গল্পের সাথে উদ্ভাবনটির পরবর্তী পরিবর্ধন পাঠককে আরও স্বপ্ন দেখাবে। এতে ছোট গল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যও ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ বজায় থাকবে।

চ) আপনার লেখার দক্ষতা উন্নত করার জন্য বিভিন্ন ছোট ছোট দক্ষতা আয়ত্ত করুন। যেমন- একজন শেফ এর শিখতে হয় কিভাবে টুকরো করে কাটতে হয়, আগুনে টেলে নিতে হয় এবং গ্রিল করতে হয়। তার বুঝতে হবে কিভাবে একটি খাবার নির্বাচন করবে যা একই সাথে পুষ্টিকর এবং স্বাদেও ভালো হবে। তাকে রুটি তৈরী করা এবং নিঁখুতভাবে গাজরের ফুল তৈরী করা প্র্যাকটিস করতে হয়। রান্নার ছোট ছোট দক্ষতাগুলো আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু লেখার দক্ষতাগুলো আমাদের কাছে অস্পষ্ট। তবে লেখার দক্ষতার জট খোলা ততটা কঠিন নয় যতটা আপনি ভাবছেন। আপনি একের পর এক লেখার অনুশীলন করতে পারেন, যেভাবে একজন শেফ অনুশীলন করে।

ছ) লেখা আরো বিকশিত করার জন্য উপযুক্ত তথ্য যোগ করুন আপনার লেখায়। পাঠকরা সাধারনত ধারনা, পরামর্শ, সান্ত্বনা, এবং অনুপ্রেরণার জন্য মুখিয়ে থাকে। উপযুক্ত বিষয়বস্তু পরিবেশন করে তাদের আকাঙ্ক্ষা আরো বাড়িয়ে তুলুন। লেখার জন্য অনুপ্রেরণা খুঁজে বের করুন আমরা কেউই চমৎকার লেখক হয়ে জন্মগ্রহন করিনি।

জ) আপনার লেখার পাঠক কারা সেটা বুঝে লিখুন। আপনার বিষয়বস্তু আরো উন্নত করুন। যেমন আপনার অতিথি যদি ডায়েট করেন তাহলে চকোলেট কেক তাকে প্রভাবিত করবে না। অতিথির যদি এলার্জি থাকে তাহলে তার জন্য চিংড়ি রান্না করা বৃথা। সেভাবে পাঠকের জন্য কিছু লেখাও একই ব্যাপার।

ঝ) চমকদার বাক্য ভালো লেখার প্রধান উপাদান। কিভাবে সঠিক শব্দ বাছাই করতে হবে তা চর্চা করুন এবং এমন শব্দ যা আপনার লেখাকে বিস্বাদ করে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া শিখুন। আপনার লেখায় আলোচনার মধ্যে প্রশ্ন থাকতে পারে। এমন সাবলিল ভাবে লিখুন যেন পাঠক প্রতিটি অনুচ্ছেদ পড়তে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।

ঞ) ভাষা হতে হবে নিজস্ব। আমরা সবাই একই ভাষায় কথা বললেও সবারই কথা বলার ভঙ্গি আলাদা। সে রকম লেখার ক্ষেত্রেও ভাষাটা নিজস্ব হওয়া চাই। একই কথা অনেকভাবে যে বলা যায়, সেটি রপ্ত করতে হবে। বড় লেখকেরা কীভাবে ভাষার ওপর তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন, তা যদি বোঝা যায়, কাজটা সহজ হয়।

ট) লেখায় কোনো শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার না করাই উত্তম। যদি করতেই হয়, তা হলে শব্দের পুরোপুরি প্রথমে লিখে পরবর্তিতে সংক্ষিপ্ত রূপে লিখুন এবং সংক্ষিপ্ত শব্দের অর্থ পাঠককে জানিয়ে দিন।

ঠ) আমরা কথা বলার সময়ে সহজ ভাষায় বললেও লেখার সময় কিছুটা কঠিন ভাষা প্রয়োগ করে ফেলি। যেমন, অনেক দিন অতিবাহিত হয়ে গেল, এর বদলে লেখা যায় – অনেক দিন কেটে গেল অথবা অনেক দিন চলে গেল। বর্ণনা ও সংলাপ আকর্ষণীয়, বুদ্ধিদীপ্ত এবং গল্পকে টেনে নেয়ার গুণসম্পন্ন হতে হবে। তাৎপর্যহীন বর্ণনা পরিহার করা উচিত। স্রেফ চা খাওয়া নিয়ে লাইনের পর লাইন লিখে পৃষ্ঠা বাড়ানোর দরকার নেই। বারবার মিনু বলল, দীপু বলল লেখার দরকার নেই। প্রথমেই প্রতিষ্ঠা করুন কথাগুলো কে বলছে। তৃতীয় অথবা চতুর্থ লাইনের পর থেকে নাম দেয়ার দরকার নেই। তবে সংলাপের যেন খেই হারিয়ে না যায় সে জন্য মাঝে মাঝে নাম উল্লেখ করতে হয়। চরিত্রের পুরো নাম প্রথমে দেয়া যেতে পারে যেমন, আসাদ চৌধুরী, এরপর শুধু আসাদ লেখা উচিত।

ড) মুক্তার মতো হাসি, পরীর মতো সুন্দর, হরিণীর মতো চোখ, এসব বহুল ব্যবহৃত বর্ণনা না দেয়াই ভাল। নতুন ধরণের বর্ণনা দিন। লেখা যায় সে খুব সুন্দর ছিল। অনেকে লেখেন, সে অসম্ভব সুন্দর ছিল। এখানে অসম্ভব শব্দটির প্রয়োগ ভুল। অসম্ভবই যদি হবে, তাহলে মেয়েটি সুন্দর হলো কী করে? আধুনিক রূপক এবং নতুন ধরনের বিশ্লেষণ ও বাক্যবিন্যাস ব্যবহার করতে পারলে ভাল।

ঢ) লেখা হবে সাধারণ ও সাবলীল। লেখায় পান্ডিত্যপূর্ণ শব্দ বা বাক্য ব্যবহার না করাই উত্তম। এমন শব্দ/বাক্য ব্যবহার করলে পাঠক লেখা পাঠ করে আনন্দ পায় না বরং ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্ত হন। লেখককে সব সময় মনে রাখতে হবে লেখা পাঠকের জন্য, পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য। এটি যতো সহজ-সরল হয় ততোই মঙ্গল।

ণ) অল্প কথায় সঠিক বিষয়বস্তু তুলে ধরার কথা বিবেচনায় রেখে লেখা তৈরি করতে হবে। লেখায় অহেতুক শব্দ/বাক্য ব্যবহার না করাই ভালো। অল্প কথায় লেখার সারমর্ম তুলে ধরতে হবে। পাঠক যেন বিষয়বস্তু সহজে যাতে বুঝতে পারে এমনভাবে লেখা তৈরি করতে হবে। লেখায় অহেতুক আলাপচারিতা পরিহার করা শ্রেয়।

ত) লেখা গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য প্রয়োজনে ছবি, ডায়াগ্রাম, মানচিত্র, টেবিল, চার্ট, সারণি, ছক প্রভৃতি সংযোজন করা যেতে পারে। অনেক সময় পাঠক লেখা বুঝতে না পারলেও ছবি বা ডায়াগ্রাম দেখে সহজে বুঝতে পারে। লেখাকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে পাঠক লেখার গভীরে গিয়ে সহজে বিষয়বস্তু বুঝতে পারে।

প্রয়োজনীয় সংযোজন ও সংশোধন শেষে পুণরায় পড়ুন

পাঠকের দেয়া মতকে গুরুত্ব দিয়ে তা আপনার গল্পে যোগ বা বিয়োগ করুন। সবার মতামতের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া গল্পটি আবারো পড়ুন। দেখুন কেমন হলো আপনার এই গল্পটি। সাধারণ কোনো গল্পই কি অনন্য হয়ে উঠলো না!! যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিত, আপনি আসলেই একজন জিনিয়াস। অসাধারণ আপনার লেখনী শক্তি, সৃজনশীলতা, উদ্যম। সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক আপনি।

(গল্প লেখার তাত্ত্বিক আলোচনা করলাম না। মনোমীথ, দি মাউন্টেইন, নেসটেড লুপস, স্পার্কলিংকস, কনভার্জিং আইডিয়াস, ফলস স্টার্ট, পেটাল স্ট্রাকচার প্রভৃতি গল্প লেখার কৌশলগুল বেশী তাত্ত্বিক বিধায় এগিয়ে গেলাম। কেউ যদি আগ্রহী হন তাহলে ব্যক্তিগতভাবে জেনে নিতে পারেন। অনেকে যদি আগ্রহী হন তাহলে পরেআমরা আলোচনা করবো।)
untitled

মোঃ আতিকুর রহমান
সহকারী পরিচালক, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, গোহাইল রোড, সূত্রাপুর, বগুড়া।

Categories: পরিকল্পনা