আজ- শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Email *

শিরোনাম

  Empathy, Patriotism & Commitment Group: একটু বিশ্লেষণ       বৃক্ষ রোপণের ৭ তারকা ও ১ শিল্পী       ‘পরিবর্তন চাই’ এর চার বছর       নামে কী বা আসে যায়       লৌহজং ‘সামাজিক আন্দোলন’ – আমার সুখ স্মৃতি       `একাত্তরের জননী’র সন্তানেরা       মনোয়ারাঃ সক্ষম সন্তানদের মরতে বসা মা       নদী-খাল উদ্ধারে সফল, সফলতার পথে এবং সম্ভাব্য অভিযান       মাছের পেটের রড থেকে গরাদঘরে       পাবনায় নৌ-র‌্যালিঃ নদী উদ্ধারে নতুন উদ্ভাবন       আক্রান্ত সিটিজেন জার্নালিজম       দক্ষিণাঞ্চলে দুই সপ্তাহব্যাপী নিম্নচাপঃ উদ্ভাবন ও সিটিজেন জার্নালিজম বিব্রত       আইনজীবীর হৃৎকম্পে কাঁপছে দেশ       পাবলিক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি       জনশক্তিতে উদ্ভাবন       ফেইসবুক, বাংলাদেশ সরকার এবং রাজার ঘণ্টা       অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশাল মিডিয়া       জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রথা ভাঙ্গার গল্প       শিয়ালের কামড় থেকে সোশাল মিডিয়ার কামড়       সোশাল মিডিয়া ইনোভেশন এ্যাওয়ার্ডের ১ বছর ১ মাস    

উদ্ভাবনের গল্প: গুগল ম্যাপসের সাথে প্রেম

রাজশাহীতে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউট খোঁজার গল্পটা আগে বলি। প্রায় আধ ঘন্টা ধরে খুঁজে আমার তখন এদিক ওদিক অবস্থা। মানে কেউ বলছে এদিকে, কেউ বলছে ওদিকে। এমন সময় বড় ভাই ফোন করলেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। কথা প্রসঙ্গে বললাম একটা অফিস খুঁজে পাচ্ছি না।
: কোন অফিস?
: মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউট।
: একটু দাঁড়াও, দেখি পাই কিনা।
: কি পাবেন?
: থামো, পেয়েছি, তুমি এখন কোথায়?
: সিএন্ডবি মোড়ে
: সোজা পশ্চিম দিকে যাও। যাচ্ছো?
: জি
: ডান দিকে হামদর্দ এর দোকান দেখতে পাচ্ছো?
: না তো
: আচ্ছা আর একটু সামনে যাও, পাবে।
: দারুন ব্যাপার, হামদর্দের দোকান তো সত্যিই আছে।
: গুড, আরও সামনে যাও, ২০০ গজের মতো।

আর একটু সামনে গিয়ে দেখি অফিসের সাইনবোর্ড। এই ঘটনা ৪০ বছর পূর্বের না, মাত্র ৪০ দিন আগের। গুগল ম্যাপসের নাম শুনেছিলাম কিন্তু এমন বাস্তব ব্যবহার জীবনে সেই প্রথম।এবং প্রথম পরিচয়েই প্রেম। সেই থেকে এই গল্পের শুরু। কাজেই এটি একটি প্রেমের গল্প।

অনেক শহরেই অনেক অফিস খুঁজে পাওয়াটা একটা সমস্যা। বিশেষ করে যেসব অফিসে জনসমাগম কম, মানুষ খুব একটা চেনে না, সেসব অফিস। মনে আছে জামালপুরে পাসপোর্টে অফিস খুঁজতে গিয়ে ডিসেম্বর মাসেও গলদঘর্ম হয়েছিলাম। জুন মাসের গরমে দিনাজপুরে জেলা মার্কেটিং অফিস খুঁজতে শরীরঘর্মও হয়েছিলাম। পটুয়াখালীতে একরকম সমবায় সমিতি গঠন করে (১৩জনকে জিজ্ঞেস করে) সমবায় অফিস খুঁজে পেতে হয়েছিল। চট্টগ্রামে জনশক্তি অফিস প্রথম দিন খুঁজেই পাইনি। এমন অভিজ্ঞতা কম-বেশী সবারই আছে।

তো গুগল ম্যাপসের সাথে প্রথম সাক্ষাতে (ঠিক সাক্ষাত না, যুতসই শব্দ পাচ্ছি না) প্রেম হবার পর মনে হলো তাকে আমার সব বলতে হবে। জানা সবকিছু না জানানো পর্যন্ত যেন শান্তি নেই। আমি চারপাশের সবকিছু তাকে জানাতে শুরু করলাম। শুধু নাম না, নামের সাথে সেই জায়গার ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর, মান কেমন, কখন খোলা থাকে সবকিছু। একটি করে তথ্য ম্যাপসে যোগ করি, একটি করে পয়েন্ট পাই। মজার খেলা। নেশার মতো হয়ে গেল। যেখানে যাই ছবি তুলি আর গুগল ম্যাপসে যোগ করি। রিক্সাওয়ালারা খুবই বিরক্ত হতো। ২০/২৫ ফুট না যেতেই থামতে বলি, ছবি তুলি, ম্যাপসে আপলোড করি, তারপর বলি যাও। আবার ২০ ফুট, কখনও ১০ ফুটেই দাঁড়াতে বলি। কি করবো, গুগল ম্যাপসে অনেক দোকান, ব্যাংক, অফিস আছে আবার অনেক কিছু যে নেইও। যেগুলো আছে সেগুলোতে ছবি যোগ করি, যেগুলো নেই সেসব এ্যাড করি, অনেক কাজ।

এসব করতে করতে একদিন হঠাৎ মনে হলো আমাদের ডিপার্টমেন্টের সব অফিসগুলোকে যোগ করি। ৪২টি জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, ৪টি বিভাগীয় কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, ৬ টি ইন্সটিটিউট অফ মেরিন টেকনোলজি, ৪৭টি টিটিসি, সবমিলিয়ে ৯৫টি প্রতিষ্ঠান সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। গুগল ম্যাপসে এরকম গুষ্টিসুদ্ধ উপস্থিতি কোনো ডিপার্টমেন্টের আছে বলে শুনিনি। এই কাজে নিজেকে একজন পাইওনিয়ার মনে হলো। মনে হলো ইনোভেশনের সব পুরস্কারের সাথে আমার কাবিন হয়ে গেছে, শুধু অনুষ্ঠান করে বাড়িতে তোলার অপেক্ষা।

পাইওনিয়ার যখন এটুআইতে ফোন করলো, বলা হলো উপকরণ-১৩ পূরণ করে পাঠাতে। এই উপকরণের নম্বর কে ১৩ দিয়েছে জানি না। এটি পূরণ করতে জান বের হয়ে যায়। সমাধান বের করে ফেলেছি কিন্তু সমস্যা খুঁজে পাই না। গুগল ম্যাপসে মাঠ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য ও ছবিসহ যোগ করে কোন সমস্যার সমাধান করছি বুঝতে পারছি না। এসময় একটি ঘটনায় উপকরণ অপয়ার যাঁতায় পিষ্ট হয়ে মরতে বসা আইডিয়াটি নবজীবন পেল।

মোহাম্মদপুরের এক মহিলা, মজিদা সৌদি আরব যেতে চায় বাড়ির কাজে। সরকারী ভাবে যাবার জন্য জনশক্তি অফিসে যেতে বলেছিলাম। সে অফিস খুঁজে বেড়ানোর সময় একজন এক ম্যানপাওয়ার রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসকে জনশক্তি অফিস বলে তাকে সেখানে পাঠিয়ে দেয়। তারপর মজিদা সেই এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে পড়ে। সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ দুতাবাসের সেফ হোমে দুমাস থেকে গত পরশু দেশে ফিরে দেখা করতে এসেছে। ঘটনা তাহলে জনশক্তি অফিস খুঁজে না পাওয়া থেকে শুরু। আর আমি তো অফিস খুঁজে পাওয়ার সমস্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে চারপাশ থেকে – ‘কি লাভ, কি লাভ’ শুনে শুনে হতোদ্যম হয়ে পড়েছি। তবে হ্যাঁ, এটা হয়তো প্রশ্ন উঠবে মজিদারা কি ইন্টারনেট এ্যাকটিভেটেড এ্যান্ড্রয়েড ফোন সেট ব্যবহার করে যে ম্যাপস দেখে অফিস খুঁজবে? ওরা আজ ঐরকম সেট ব্যবহার করছে না, কালও হয়তো করবে না, কিন্তু পরশু যে করবেই না তা কে বলতে পারে! প্রফেসর ইউনুস যেদিন বলেছিলেন তেঁতুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কৃষক কারওয়ান বাজারের রেট জেনে সবজি তুলবে সেদিন মজিদারা গুগল ম্যাপস দেখে অফিস খুঁজে বের করবে টাইপের অবিশ্বাসই জন্মেছিল। আর মজিদাকেই কেন দেখতে হবে? স্বামী, সন্তান, ভাই, দেবর যে কেউ ম্যাপস দেখে তাকে সাহায্য করতে পারে। জনশক্তি অফিসও শুধু মজিদারা খুঁজবে সেটা ঠিক না। এই অফিস খুঁজতে পারে প্রবাস গমণেচ্ছুক কর্মী ও তার আত্মীয়-স্বজন, প্রবাসে মৃত কর্মীর পারিবারিক সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন, প্রবাসে মৃত কর্মীর উত্তরাধিকারীগণ, টিটিসি ও মেরিন ইন্সটিটিউটে ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রী ও তার পরিবার, প্রবাসী বিষয়ক গবেষক, ম্যানপাওয়ার রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক-কর্মচারী, ট্যুরিস্ট, সাংবাদিক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের আত্মীয়-স্বজন তথা আপামর জনসাধারণ।

কাজটি সহজ না। নিজ অফিস গুগল ম্যাপসে যোগ করার সচিত্র বর্ণনা ইমেইল করে পাঠিয়ে দেখেছি অনেকেই পারছে না। ফোন করেও লাভ হয়নি। অফিসের ছবি ও তথ্য পাওয়াটা সমস্যা না, সমস্যা হলো নিখুঁতভাবে অফিসের লোকেশন চিহ্নিত করা। লোকেশন ঠিক করার কাজটি সেই অফিসে বসে কাউকে করতে হবে। আমি গিয়ে করতে পারি তাতে খরচ ও সময় লাগবে প্রচুর। তাই জনশক্তি ব্যুরোর ডিজিকে অনুরোধ করা হয়েছে সব প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়ে আগামীতে কোনো সমন্বয় সভা করলে সেখানে একটি সেশন এর জন্য রাখতে। এরপরও যাঁরা পারবেন না সে কয়টি অফিসে নিজেই যাবো। কাজটি শেষ করবোই।

এটি নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠানগুলো খোঁজার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময় ও খরচ কমাবে। কিন্তু সেটি নির্দিষ্টভাবে অংকের হিসাবে প্রকাশ করা কঠিন। আজ গুগল ম্যাপসে কিছু যোগ করাটা ফ্রি কিন্তু কাল যে ফি দিতে হবে না কে বলতে পারে! শুরুতে হয়তো খুব কম জনই ম্যাপস দেখে অফিস খুঁজবে। কিন্তু এর ব্যবহার দিন দিন বাড়বে। কয়েক বছর আগেও যেমন ভাবা যায়নি হাতে হাতে ফোন থাকবে।

গুগল ম্যাপসে যতো বেশী প্রতিষ্ঠান যোগ করা হবে ততো এটি সমৃদ্ধ হবে এবং ব্যববহারকারীও বাড়বে। পৃথিবীর যে ৪২টি দেশের ম্যাপস কম সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তার অন্যতম। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় এটি সমৃদ্ধ হতে পারে। এখানে নিজের অফিস যোগ করা শিখে সবাই হয়তো থেমে যাবেন না। অনেকেই আশপাশের দোকান, ব্যাংক, পেট্রোল স্টেশন, এটিএম বুথ, স্কুল, হাসপাতাল, কোচিং সেন্টার, সেলুন, লন্ড্রি, ফার্নিচার শপ, মসজিদ, মন্দির, এ্যাপার্টমেন্ট, ফার্মেসি, বইয়ের দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, টি স্টল, পানের দোকান, বিভিন্ন শো-রুম এসব যোগ করতে শুরু করবেন। যা দেশের পর্যটন শিল্পের প্রসারে ভূমিকা রাখবে।

কোনো ডিপার্টমেন্টেরই নিখরচায় মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোকে গুগল ম্যাপসে ছবি ও তথ্যসহ যোগ করার এমন সুযোগ গ্রহন না করার কারণ নেই। এটি যে শুধু সেবা গ্রহীতাদের কাজে লাগবে তা নয় সেবা দাতাদেরও কাজে লাগবে। চাকুরী জীবনে বদলী হয়ে নতুন অফিস খুঁজতে হয় সবারই। হেড অফিস থেকে অফিস পরিদর্শনে গেলে সেই অফিসটিও খুঁজে বের করতে হয়। সেবা গ্রহীতাদের তো হরদম লাগে।

অন্য অধিদপ্তরের অফিসগুলো দেখা যাক বা না যাক, জনশক্তি ব্যুরোর অফিসগুলো গুগল ম্যাপসে দেখা যাবে অচিরেই। কতোটা অচিরে এখনই বলতে পারছি না। অচিরেই বলতে পারবো।

Categories: আইডিয়া,উদ্ভাবন